বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফায় চলছে এক উত্তাল সময়। বিশ্বকাপের মালিকানা আংশিক বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাব ও নানাবিধ সমালোচনার জেরে ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এখন তীব্র তোপের মুখে। এই বিরোধ নতুন মোড় নিয়েছে যখন ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ এবং এশিয়ার এএফসি—এই তিন প্রভাবশালী কনফেডারেশন যৌথভাবে ফিফাকে ধুয়ে দিয়ে একটি কঠোর বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি বিশ্বকাপের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বেসরকারি বিনিয়োগ এনে আংশিক মালিকানা বিক্রির একটি পরিকল্পনা সামনে এনেছিল ফিফা। যদিও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ফিফা পরে সেই পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে এবং চার বছর চক্রের (২০২৭-২০৩০) জন্য ২৪৬ কোটি টাকার (২ কোটি ডলার) একটি তহবিল গঠনের কথা জানায়। তবে এর রেশ কাটেনি।
সোমবার (১০ আগস্ট) উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি’র যৌথ চিঠিতে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ‘ফুটবল কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন নয়’। চিঠিতে আরও বলা হয়, ফুটবলে নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করার বিষয় নয়। ইনফান্তিনোর নাম উল্লেখ না করলেও তার কঠোর সমালোচনা করে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘প্রতারণার মাধ্যমে যখন আস্থা নষ্ট হয়, যখন কোনো ব্যক্তি সেই সমষ্টির ঊর্ধ্বে নিজেকে স্থান দেন, যিনি তাকে কর্তৃত্ব দিয়েছিলেন, তখন তিনি তার দায়িত্ব পরিত্যাগ করেছেন।’
গত সপ্তাহে মরক্কোতে ফিফার একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে ইনফান্তিনো ক্ষমাও চেয়েছিলেন। তবু উয়েফার ৫৫ সদস্য দেশ ফিফার টুর্নামেন্ট বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। এমনকি নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস তো ফিফা সভাপতিকে অবিলম্বে পদত্যাগ করারও আহ্বান জানিয়েছেন। মরক্কোতে অনুষ্ঠিত ফিফার জরুরি বৈঠক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে উয়েফা, এএফসি এবং কনক্যাকাফের যৌথ চিঠিতে। তাদের দাবি, মরক্কোর ওই জরুরি বৈঠকে মাত্র একজন নির্বাচিত কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
শুধু তাই নয়, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ার একটি স্বাধীন তদন্ত দাবি করেছে এই তিন সংস্থা। তারা এমন একটি স্বাধীন পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন যেখানে ফিফার কোনো ভূমিকা থাকবে না এবং এই ‘গভীর বিচারবোধের ব্যর্থতা’ কীভাবে ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হবে। যৌথ চিঠিতে বলেছে, ‘ফুটবলের শক্তি সবসময়ই তার ঐক্যের মধ্যে নিহিত। আমরা এখন সেই ঐক্যের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানাচ্ছি। এমন নেতৃত্ব চাই, যা ফুটবলের সেবা করবে, ফুটবলের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে না।’
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে সংকটের মাঝেই তার বিরুদ্ধে ১৭ বছর আগের এক পরকীয়া প্রেমের অভিযোগ সামনে এনেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’। উয়েফার সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে সংস্থার এক কর্মীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। জানা গেছে, উয়েফা এই বিষয় নিয়ে তদন্তেও নেমেছে।
অন্যদিকে, ফিফা এই সমস্ত অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং সংস্থাকে দুর্বল করার একটি ‘সমন্বিত ও চলমান প্রচেষ্টা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ফিফার পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দিয়ে জানানো হয়েছে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে হলে তা ফিফার বিধি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মেনেই করতে হবে।
ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র এখন দ্বিখণ্ডিত। একদিকে যেমন উয়েফাসহ ইউরোপীয় দেশগুলো কঠোর অবস্থান নিয়েছে, অন্যদিকে আফ্রিকার ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ)-এর ৫৪ সদস্য দেশ, মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, ইকুয়েডর ও বলিভিয়া ইনফান্তিনোর পক্ষে নিজেদের সমর্থন জানিয়েছে। ফিফার ২১১ সদস্যের মধ্যে প্রায় ৭০টি অ্যাসোসিয়েশন তাকে ভোট দেবে বলে জানালেও, প্রায় এক ডজন অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে।
আগামী ২০২৭ সালের মার্চে চতুর্থ ও শেষ মেয়াদের জন্য পুনরায় ফিফা সভাপতি নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা রয়েছে ইনফান্তিনোর। তবে যেভাবে একের পর এক কনফেডারেশন তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলছে এবং আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, তাতে সিআরসেভেনের বা ফিফার মসনদে ইনফান্তিনোর টিকে থাকা এখন এক বিশাল প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।

