ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের অংশ হিসেবে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় পৌঁছেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই শীর্ষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। সপ্তাহান্তে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে চান তারা।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মস্কোয় পৌঁছে রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন উইটকফ ও কুশনার। এরপর আগামীকাল রোববার, তাদের ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন তারা।
শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, তার দুই দূত, যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন পর্যন্ত কোনো বড় অগ্রগতি আনতে পারেনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, উইটকফ ও কুশনার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলদেমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করবেন।
মস্কোর ভনুকোভো বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর রুশ কূটনীতিক কিরিল দিমিত্রিয়েভকে তাদের স্বাগত জানাতে দেখা যায়।
ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সরকারের একটি বিমান ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি থেকে মস্কোয় যায়। এর আগে, বিমানটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে হেলসিঙ্কিতে পৌঁছেছিল।
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকবার মস্কো সফর করেছেন উইটকফ-কুশনার। তবে রোববারের সফরটি হবে কিয়েভে তাদের প্রথম সফর। গত দেড় বছরে, ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক দফা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
এদিকে, মার্কিন দূতদের রাশিয়া সফরকে কেন্দ্র করে মস্কো-কিয়েভের মধ্যে হামলা বন্ধের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ক্রেমলিনের বরাতে জানিয়েছে, মার্কিন দূতদের সফরের কারণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্থানীয় সময় শনিবার মধ্যরাত থেকে তিন দিনের জন্য কিয়েভে কোনো হামলা না চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে এর আগেই শনিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, রাতভর কিয়েভ ও বোরিসপিলের বিমানবন্দরে রাশিয়া হামলা চালিয়েছে।
তার ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের আগে বিমানবন্দরগুলোতে রাশিয়ার এই হামলা তাদের সম্ভাব্য সফর এবং বিমান অবতরণের প্রস্তুতির প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘’স্পষ্টতই, বিমানবন্দরগুলোতে রাশিয়ার এসব হামলা আলোচনার এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিমানযোগে ইউক্রেনে এসে কিয়েভ বা বোরিসপিল বিমানবন্দরে অবতরণের সম্ভাব্য প্রস্তুতির প্রতিক্রিয়া।’
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ইউক্রেনে, রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই দেশটির আকাশসীমা বন্ধ রয়েছে।
শুক্রবার জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, মার্কিন দূতদের সফরের সময় রুশ আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দেবে ইউক্রেন। একইভাবে রাশিয়ার কাছ থেকেও ইউক্রেনের আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
এদিকে, ডিনিপ্রো অঞ্চলে একটি বেসামরিক ভবনে রাতভর রুশ হামলায় চারজন নিহত এবং আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন বলেও জানান জেলেনস্কি।
মস্কোয় উইটকফ ও কুশনারের এই সফরের মাত্র এক সপ্তাহ আগে রাশিয়ার রাজধানীতে বিরল সফর করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। ওই সফরে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন বা ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে গত সপ্তাহে ট্রাম্প ওই বৈঠককে ‘রুটিন’ বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
গত বছরও যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হয়। সে সময় তিন পক্ষই যুদ্ধ অবসানে একটি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিল। ইউরোপীয় মিত্ররাও প্যারিসে আলাদা বৈঠক করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেসব আলোচনায়ও কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি আসেনি।
যুদ্ধরত দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে। এর মধ্যে ইউক্রেনের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং দেশটির নিরাপত্তার নিশ্চয়তার বিষয়টি অন্যতম।
এদিকে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই তাদের আকাশপথে হামলা আরও জোরদার করেছে। ইউক্রেন জানিয়েছে, পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের অভাবে রুশ হামলা প্রতিহত করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, রুশ ভূখণ্ডে পাল্টা হামলার ক্ষেত্রে ইউক্রেন মূলত দেশটির অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
ফলে মস্কো ও কিয়েভে মার্কিন দূতদের আসন্ন বৈঠককে যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

