জীবনের নানা ঘাত ও প্রতিঘাত, দুঃখ ও বেদনা, দুশ্চিন্তা ও হতাশা নির্জন রাতকে দুর্বিষহ করে তোলে। গভীর রাতে যখন সব কোলাহল থেমে যায়, যখন ব্যস্ত জনপদে নেমে আসে শুনশান নীরবতা তখন মনের আঙিনায় ভিড় করে কত-শত স্মৃতি, বেদনাময় দিনের কথা। আর তখনই দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ঘুমও যেন মিলিয়ে যায় হাওয়ার সঙ্গে। এমন যন্ত্রণাকাতর রাতে নামাজ হতে পারে মুমিনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয়। মহান আল্লাহর দরবারে সেজদাবনত হয়ে উজার করে দিতে পারে হূদয়ের সব কথা, সব ব্যথা। মহামহিমের সঙ্গে গোপন কথোপকথনের মাধ্যমে উপশম হবে যন্ত্রণার।
নামাজ কেন উত্তম সঙ্গী
নির্ঘুম রাতে নামাজ মুমিনের সর্বোত্তম সঙ্গী। কেননা∏
১. নামাজ দুর্দিনের আশ্রয় : নামাজ মুমিনের জন্য দুর্দিনের আশ্রয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, Èহে মুমিনরা! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৩)
মূলত আশ্রয়হীনতা ও অবলম্বন খুঁজে না পাওয়ার কারণেই বিপদগ্রস্ত মানুষের ঘুম হারাম হয়ে যায়। আর নামাজ মানুষকে আল্লাহর আশ্রয়ে স্থান করে দেয়।
২. নামাজ অস্থিরতা দূর করে : নামাজ হলো আল্লাহ ও বান্দার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন। নামাজের মাধ্যমে বান্দার মনের গ্লানি, মানসিক চাপ ও অস্থিরতা দূর হয়। কেননা নামাজের সময় বান্দা নিজেকে এমন মহান সত্ত্বার হাতে সমর্পণ করে একমাত্র যিনিই পারেন সব বিপদ ও সংকট দূর করে দিতে। হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, Èযখন কোনো বিষয় রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে চিনি্তত করত, তখন তিনি নামাজ পড়তেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ১৩১৯)
৩. নামাজে মনের প্রশানি্ত : গভীর রাতে যখন ঘুম পালিয়ে যায়, যখন কিছুতেই শানি্ত মেলে না, তখন দুর্ভাবনার সাগরে ডুবে না থেকে অজু করে জায়নামাজে দঁাড়িয়ে যান। কেননা আল্লাহ নামাজে মুমিনের হূদয়ের প্রশানি্ত রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতেন, Èহে বেলাল! নামাজের জন্য ইকামত দাও। এর মাধ্যমে আমাদের প্রশানি্ত দাও।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৮৫)
৪. নামাজে চোখের প্রশানি্ত : স্বপ্নভঙ্গের দৃশ্যগুলো যখন স্মৃতির ক্যানভাস থেকে কিছুতে মোছা যায় না, চোখের সামনে বার ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য, তখন নামাজই আপনার চোখে এঁকে দিতে পারে প্রশানি্তর ছায়া, মুছে দিতে পারে কষ্টের দাগগুলো। কেননা আল্লাহর দরবারে বান্দার প্রেমপূর্ণ আত্মসমর্পণ তার এমন অপার্থিব শানি্ত এনে দেয় যে, সে পৃথিবীর সবকিছু ভুলে যেতে পারে। এজন্য নবীজি (সা.) বলতেন, Èনামাজেই আমার চোখের প্রশানি্ত রাখা হয়েছে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩৯৩৯)
৫. সিজদায় আল্লাহর নৈকট্য : পার্থিব জীবনের মোহ ও মায়া মানুষকে দুশ্চিন্তায় ফেলে। মানুষ যখন মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে, তখন সে এই মোহ ও মায়া থেকে মুক্তি পায়। ফলে তার হূদয়ের ব্যথাও উপশম হয়। সিজদায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নৈকট্য লাভ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, Èবান্দা সিজদায় আল্লাহর সবচেয়ে বেশি নিকটবর্তী হয়। সুতরাং তোমরা তাতে অধিক পরিমাণ দোয়া কোরো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৮২)
আলোচ্য হাদিস থেকে আরেকটি বিষয় জানা যায়, তা হলো আল্লাহর কাছে দোয়া ও প্রার্থনা করার উত্তম সময় হলো নফল নামাজের সিজদায়। তাই বিশ্বাসী মানুষ∏যারা আল্লাহর কাছেই মুক্তি আছে বলে বিশ্বাস করে তাদের উচিত রাতের নির্জনতায় সিজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা।
৬. নামাজে দূর হয় হতাশা : নামাজ মুমিনের অন্তর থেকে যাবতীয় হতাশা ও অস্থিরতা দূর করে দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, Èমানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অতিশয় অস্থিরচিত্তরূপে। যখন বিপদ তাকে স্পর্শ করে সে হয় হা-হুতাশকারী আর যখন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করে সে হয় অতি কৃপণ। তবে নামাজ আদায়কারী ছাড়া।’ (সুরা মাআরিজ, আয়াত : ১৯-২২)
৭. নামাজে হালকা হয় মন : মানুষের কথা ও কাজে মুমিনের অন্তরে যে গ্লানি ও ভার সৃষ্টি হয় সিজদায় অবনত হলে তা দূর হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, Èআমি জানি, তারা যা বলে তাতে তোমার অন্তর সংকুচিত হয়; সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কোরো এবং তুমি সিজদাকারীদের অন্তভর্ুক্ত হও।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৯৭-৯৮)
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, নামাজ বান্দার জন্য তখনই উপশম ও আরোগ্য হয় যখন তার অন্তরে আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও ভালোবাসা বিদ্যমান থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, Èতোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কোরো। আর এটা বিনীতগণ ছাড়া আর সবার কাছে নিশ্চিতভাবে কঠিন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৫)
আল্লাহ সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

