ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের একের পর এক হামলা নিয়ে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কুসরা ও জালুদসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব হামলায় বহু সংখ্যক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন, পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনাও। এই ঘটনার ‘তীব্র নিন্দা’ জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।
তবে নেতানিয়াহুর নিন্দার পরও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি পুলিশের দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, বসতি স্থাপনকারীদের এসব হামলাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখিয়ে বৃহত্তর বসতি সম্প্রসারণ প্রকল্পকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে আড়াল করাই নেতানিয়াহুর এই অবস্থানের মূল উদ্দেশ্য।
একই সময়ে ফারাআ শরণার্থীশিবির, আল-বিরেহ ও আল-মুঘাইয়ের এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালিয়ে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। হেবরনের পুরোনো শহরেও সেনারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়।
জালুদ গ্রামে একটি ফিলিস্তিনি পরিবার এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির সংবাদকর্মীদের একটি দল হামলার শিকার হয়। আররাবেহ এলাকায় মেভো দোতান বসতির কাছে দুজন ফিলিস্তিনিকেও মারধর করা হয়। সপ্তাহান্তজুড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা এভাবেই চলছিল।
এসব হামলার পর আন্তর্জাতিকভাবে ইসরায়েলের ভাবমূর্তির ক্ষতি কমাতে দেশটির রাজনীতিকেরা সমন্বিতভাবে অবস্থান নেয়া শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কুসরা ও জালুদে সংঘটিত ‘অপরাধমূলক সহিংসতার’ তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এসব ঘটনার জন্য আইন ভঙ্গ, সেনাবাহিনীর কাজে বাধা এবং বিশ্বে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে ‘কয়েকজন দাঙ্গাবাজকে’ দায়ী করেন।
তিনি প্রকাশ্যেই বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন ‘দাঙ্গাবাজদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করে’—এটি তিনি আশা করেন। তবে নেতানিয়াহুর এই প্রকাশ্য ক্ষোভের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুখোশ পরা বসতি স্থাপনকারীদের খোলা পিকআপে করে কুসরা ও জালুদ গ্রামে ঢুকে হামলা চালানোর ভিডিও পাওয়া গেছে। এসব দৃশ্যমান প্রমাণ এবং নেতানিয়াহুর গ্রেপ্তারের নির্দেশ সত্ত্বেও মোশে পিঞ্চির নেতৃত্বাধীন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি পুলিশের জেলা শাখা কাউকেই গ্রেপ্তার করেনি।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও একই সুরে এসব ঘটনাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইসরায়েলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি হারজগের বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি দাবি করেন, পশ্চিম তীরে বসবাসকারী পাঁচ লাখ ইসরায়েলির অধিকাংশই ‘মুষ্টিমেয় কিছু দুষ্কৃতকারীর কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত বিরক্ত’।
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও সপ্তাহান্তে আরেক দফা সহিংস তাণ্ডবকে ‘নৈতিক কলঙ্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলিদের সহিংসতা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতাকে তিনি ‘জাতীয় লজ্জা’ বলেও মন্তব্য করেন।
তবে আল-জাজিরাকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা এই নিন্দা আসলে সরকারের একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল। কারণ একই সময়ে সরকার পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার প্রক্রিয়া সক্রিয়ভাবে এগিয়ে নিচ্ছে।
লেখক, বিশ্লেষক এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক ইহাব জাবারিন বলেন, আন্তর্জাতিক নজরদারি থেকে বৃহত্তর বসতি স্থাপন প্রকল্পকে আড়াল করতে নেতানিয়াহু ‘রাজনৈতিকভাবে দায় এড়ানোর একটি প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করছেন।
জাবারিন বলেন, তিনি এমন একটি রাজনৈতিক ধারণা তুলে ধরছেন যেখানে পাঁচ লাখ বসতি স্থাপনকারীকে বৈধ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আর কয়েক ডজনকে বিচ্যুত বা ব্যতিক্রমী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তার ভাষায়, সবচেয়ে প্রকাশ্য ও গুরুতর ঘটনাটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার—অথবা ব্যবস্থা নেয়ার ভান করার মাধ্যমে বৃহত্তর ব্যবস্থাটিকে রক্ষা করাই নেতানিয়াহুর লক্ষ্য।
জাবারিন আরও বলেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে তুলে ধরে নেতানিয়াহু এগুলোকে বসতি স্থাপন প্রকল্পের বৃহত্তর কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা করতে চাইছেন।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
অনেকের মতে, দখল করা পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের লাগামহীন সহিংসতা বড় ধরনের ফিলিস্তিনি গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিতে পারে বলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর যে আশঙ্কা রয়েছে, সেটিই নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যের পেছনের আসল কারণ।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল আভি ব্লুথের সাম্প্রতিক একাধিক রুদ্ধদ্বার নিরাপত্তা মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে যে বসতি স্থাপনকারীদের এ ধরনের ‘জাতীয়তাবাদী অপরাধ’ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
জাবারিন বলেন, ‘সেনাবাহিনী নেতানিয়াহুর সঙ্গে লাভ-ক্ষতির হিসাবের ভাষায় কথা বলে’। তিনি বলেন, কয়েক ডজন বসতি স্থাপনকারী হামলা চালালে সেনাবাহিনীর সামনে নতুন একটি সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং সেখানে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করতে হয়। নেতানিয়াহু এই সহিংসতাকে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা হিসেবে অগ্রহণযোগ্য বলেননি; বরং বলেছেন, এটি সেনাবাহিনীর কাজে বাধা সৃষ্টি করছে।
ইসরায়েলি রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক মামুন আবু আমের অবশ্য বসতি স্থাপনকারীদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ধারণা নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, এসব হামলার সময় ইসরায়েলি সেনারা নিয়মিতভাবেই বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা দেয়। অন্যদিকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করা ফিলিস্তিনিদের কঠোর শাস্তি দেয়া হয়।
আবু আমের বলেন, ‘সরকারের সমর্থন ও সুরক্ষা ছাড়া বসতি স্থাপনকারীরা কোনও হামলা চালানোর মতো সাহসী নয়’। এ প্রসঙ্গে তিনি এমন ঘটনাগুলোর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার প্রতিরোধ করায় ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনী।
পরিকল্পিতভাবে বসতি সম্প্রসারণ
ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বসতি স্থাপনকারীদের পৃথক হামলা থেকে নিজেদের দূরে রাখলেও সরকার একই সময়ে পরিকল্পিতভাবে তাদের উপস্থিতি বাড়াতে অর্থ দিচ্ছে, বৈধতা দিচ্ছে এবং নতুন বসতি সম্প্রসারণ করছে।
ইসরায়েলি সংগঠন পিস নাউয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির পর থেকে নেতানিয়াহুর ব্যাপক প্রভাব থাকা পরবর্তী সরকারগুলো পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।
৩০ বছর আগে পশ্চিম তীরে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার এবং পূর্ব জেরুজালেমে ১ লাখ ৪০ হাজার বসতি স্থাপনকারী ছিল। বর্তমানে পশ্চিম তীরে এই সংখ্যা বেড়ে ৪ লাখ ৬৫ হাজার এবং পূর্ব জেরুজালেমে ২ লাখ ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলের বর্তমান কট্টর ডানপন্থি সরকার এই প্রক্রিয়াকে নজিরবিহীন গতিতে আরও ত্বরান্বিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই এক বছরেই ইসরায়েল সরকার পশ্চিম তীরে ৫৪টি নতুন বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। ২০২৪ সালে অনুমোদিত পাঁচটির তুলনায় এটি ১০ গুণেরও বেশি।
একই সময়ে ৮৬টি নতুন বসতি স্থাপনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। অধিকৃত এলাকাজুড়ে ৬৩ হাজার ৩১১টি আবাসন ইউনিটের অনুমোদনও দেয়া হয়েছে। এটি একটি রেকর্ড।
এছাড়া অধিকৃত অঞ্চলটির ওপর ব্যাপক প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকা অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ সম্প্রতি বসতি সম্প্রসারণে ‘বিপ্লবের’ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যেই এসব নির্মাণকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকানোর সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
সম্প্রতি নেতানিয়াহু সরকার ২৭১ বিলিয়ন ডলারের একটি রেকর্ড জাতীয় বাজেট পাস করেছে। এতে আইনি কাঠামো পাশ কাটিয়ে বসতি ও জাতীয় মিশনবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে ৪০০ মিলিয়ন শেকেল (১৩৪ মিলিয়ন ডলার) দেয়া হয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ই অবৈধ বসতি স্থাপনকেন্দ্রকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক কার্যালয় (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বাড়ছে। শুধু চলতি বছরেই এমন ১ হাজার ৫৪০টির বেশি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যাতে ফিলিস্তিনিরা হতাহত হয়েছেন অথবা তাদের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
ওসিএইচএ বলেছে, প্রতি মাসে এসব হামলার যে গড় সংখ্যা, তা রেকর্ড রাখা শুরুর পর অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় এখন বেশি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সহিংসতা এবং ফিলিস্তিনিদের জমি দখলের ঘটনার এই নজিরবিহীন বৃদ্ধির পরও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া মূলত কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ইউরোপের দেশগুলো এবং অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) ই-১ প্রকল্পসহ সাম্প্রতিক বসতি অনুমোদনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখানে বড় ধরনের দ্বিচারিতা দেখা যাচ্ছে।
আবু আমের বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর বদলে তারা মাত্র কয়েকজন বসতি স্থাপনকারীর ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তিনি বলেন, ই-১ প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করাসহ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে সম্প্রতি পশ্চিমা দেশগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছে। কিন্তু এসব বক্তব্য বাস্তব কোনও পদক্ষেপে রূপ নেয়নি।
এর বিপরীতে তিনি উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে প্রমাণিত না হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থার অর্থায়ন বন্ধ করতে পশ্চিমা ২৮টি দেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল।
ব্যক্তিগত বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস কর্মকাণ্ডকে তাদের অস্ত্র, অর্থ ও সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে আলাদা করে দেখানোর মাধ্যমে ইসরায়েল তার বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য অর্থাৎ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়ভাবে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার কাজকে এগিয়ে নিচ্ছে।

