ঋণের কিস্তি বকেয়া পড়লেই গ্রাহককে যখন-তখন ফোন করে উত্যক্ত করা, হুমকি-ধমকি দেওয়া কিংবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার দিন শেষ হচ্ছে। ঋণ আদায়ের নামে ব্যাংক ও তাদের নিয়োজিত এজেন্টদের এমন দৌরাত্ম্য রুখতে অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা জারি করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক-রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন এই নির্দেশনা কার্যকর হবে।
আরবিআইয়ের নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ব্যাংক বা তাদের অনুমোদিত ঋণ আদায়কারী এজেন্টরা কেবল সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। তবে গ্রাহক নিজে যদি অন্য কোনো সময়ে কথা বলতে সম্মত হন, তবেই সেই সময়ে যোগাযোগ করা যাবে। এ ছাড়া পরিবারে কোনো শোকের পরিবেশ, চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে কোনো অবস্থাতেই গ্রাহককে ফোন বা বিরক্ত করা যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে, বকেয়া আদায়ের অজুহাতে গ্রাহককে কোনো ধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শন, গালিগালাজ কিংবা কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বারবার ফোন করে মানসিক চাপ সৃষ্টি করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে জনসমক্ষে কাউকে অপমান করা, পরিবার বা জানমালের ক্ষতির হুমকি দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা অডিও-ভিডিও প্রকাশ করে সামাজিকভাবে হেয় করা যাবে না।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এজেন্টরা চাইলেই হুট করে গ্রাহকের বাসা কিংবা কর্মস্থলে চড়াও হতে পারবেন না। সরাসরি সাক্ষাতের অন্তত একদিন আগে গ্রাহককে অবহিত করতে হবে এবং প্রথমে গ্রাহকের সুবিধাজনক স্থানে বসার চেষ্টা করতে হবে। গ্রাহক যদি বারবার নির্ধারিত স্থানে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হন, কেবল তখনই তাঁর বাসা বা কার্যালয়ে যাওয়া যাবে। ওই সময় এজেন্টের কাছে বৈধ পরিচয়পত্র, ব্যাংকের অনুমতিপত্র ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকা বাধ্যতামূলক।
গ্রাহকের সুরক্ষায় আরবিআই আরও জানিয়েছে, ঋণ আদায়সংক্রান্ত প্রতিটি ফোনকলের রেকর্ড অন্তত ছয় মাস সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে কোনো অভিযোগ উঠলে তা সহজে যাচাই করা যায়। কোনো ব্যাংক যদি ঋণ আদায়ের কাজ তৃতীয় পক্ষের কোনো সংস্থাকে দেয়, তাহলেও সেই এজেন্টের যেকোনো অপকর্মের দায় মূল ব্যাংক এড়াতে পারবে না। এমনকি এজেন্টরা যাতে অতিরিক্ত কমিশন বা প্রণোদনার লোভে পড়ে গ্রাহকের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে, সে বিষয়েও ব্যাংকগুলোকে নজর রাখতে বলা হয়েছে।
এদিকে ঋণে কেনা স্মার্টফোন, ট্যাবলেট বা ল্যাপটপের মতো ডিজিটাল ডিভাইসের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম বেধে দিয়েছে আরবিআই। কিস্তি বকেয়া পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডিভাইস লক বা বন্ধ করা যাবে না। অন্তত ৩০ দিন বকেয়া থাকার পর আংশিক নিয়ন্ত্রণ এবং টানা ৬০ দিন বকেয়া থাকলে ডিভাইসটি সম্পূর্ণ লক করা যাবে। তবে লক করা হলেও ইনকামিং কল, এসএমএস, জরুরি যোগাযোগ ও জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় ফিচারগুলো সচল রাখতে হবে। কোনোভাবেই ব্যাংক গ্রাহকের ব্যক্তিগত গ্যালারি বা তথ্যে প্রবেশ করতে পারবে না। আর বকেয়া পরিশোধের এক ঘণ্টার মধ্যে ডিভাইস সচল করতে ব্যর্থ হলে, প্রতি ঘণ্টার জন্য ব্যাংককে ২৫০ রুপি করে গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
ভারতের আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডিপিডিজিরোর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী অনন্ত শ্রফ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আরবিআইয়ের এই পদক্ষেপ ঋণ আদায় ব্যবস্থায় কেবল আংশিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার। এই নিয়মগুলো কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
সূত্র: এনডিটিভি

