মানুষের মতো দেখতে ও মানুষের জন্য তৈরি পরিবেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবটের বিক্রি গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ হাজার ইউনিটে পৌঁছেছে। শিল্প ও পেশাগত বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য এসব রোবট বিক্রি হয়েছে। আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স ফেডারেশন (আইএফআর) সংকলিত পরিসংখ্যানের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।
বর্তমানে বিক্রির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও আগামী কয়েক বছরে হিউম্যানয়েড রোবটের বাজারে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিশ্বের শিল্প রোবটের সবচেয়ে বড় বাজার চীনে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
গত মাসেই, চীনে, আয়োজিত রোবট গেমসে হিউম্যানয়েড রোবটের দৌড় ও বক্সিং প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শিল্প ও গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের মতো রোবটের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
আইএফআরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো রোবটকে হিউম্যানয়েড হিসেবে বিবেচনা করতে হলে তার চেহারা মানুষের মতো হতে হবে এবং মানুষের জন্য তৈরি পরিবেশে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম হতে হবে। এ ধরনের রোবটের পা থাকতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আসলে নেই।
প্রকাশের আগে, আইএফআরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। প্রযুক্তি খাতজুড়ে হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে বিপুল বিনিয়োগ ও নানা চমকপ্রদ প্রদর্শনী চললেও, এই প্রযুক্তির বাস্তব বাজারের আকার সম্পর্কে শিল্পজুড়ে পাওয়া তথ্যের মধ্যে আইএফআরের হিসাব অন্যতম প্রথম পরিমাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিশ্বে মোট রোবটের সংখ্যার তুলনায় হিউম্যানয়েড রোবটের সংখ্যা এখনো ‘অত্যন্ত সামান্য’ বলে জানিয়েছেন জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টভিত্তিক আইএফআরের মহাসচিব সুজানে বিলার।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৪২ হাজার সাধারণ শিল্প রোবট স্থাপন করা হয়েছিল। একই বছরে পরিবহন, আতিথেয়তা ও পরিচ্ছন্নতার মতো কাজে ব্যবহারের জন্য আনুমানিক আরও ১ লাখ ৯৯ হাজার সার্ভিস রোবট বিক্রি হয়।
২০২৫ সালের শিল্প ও সার্ভিস রোবটের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করবে আইএফআর।
তবে গত বছর, বিক্রি হওয়া হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর একটি বড় অংশ এখনো সরাসরি উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিলার। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন কোম্পানি এসব রোবট কিনেছে মূলত তথ্য সংগ্রহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেল উন্নত করার কাজে ব্যবহারের জন্য।
অটোমোবাইল নির্মাতারা হিউম্যানয়েড রোবটের প্রাথমিক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাদের কারখানায় পরীক্ষামূলকভাবে অল্পসংখ্যক রোবট ব্যবহার করছে। বিলারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পরীক্ষামূলক প্রকল্পে কোনো কারখানায় এক অঙ্কের সংখ্যা, আবার কোথাও দুই অঙ্কের সংখ্যক রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রায় তিন দশক ধরে বিশ্বব্যাপী রোবট শিল্পের পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে আসছে আইএফআর। তবে এবারই প্রথমবারের মতো তাদের বড় পরিসরের শিল্প ও সার্ভিস রোবটের তথ্যের সঙ্গে আলাদাভাবে হিউম্যানয়েড রোবটের বিক্রির হিসাব যুক্ত করা হয়েছে।
হিউম্যানয়েড রোবটের ভবিষ্যৎ বাজার নিয়ে অবশ্য বড় ধরনের প্রত্যাশা রয়েছে। ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চের এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯০ হাজার হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ হতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
আইএফআরের হিসাব প্রস্তুত করা হয়েছে বিভিন্ন রোবট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় পর্যায়ের শিল্প সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। তবে এই পরিসংখ্যানে ভোক্তা পর্যায়ে ব্যবহারের জন্য তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত রোবট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত রোবটকেও আলাদাভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে আইএফআর।
ফলে বর্তমানে হিউম্যানয়েড রোবটের বিক্রির পরিমাণ সামগ্রিক রোবট বাজারের তুলনায় অনেক ছোট হলেও, বড় বিনিয়োগ, গবেষণা এবং শিল্পকারখানায় পরীক্ষামূলক ব্যবহারের কারণে আগামী বছরগুলোতে এই প্রযুক্তির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

