হে স্নেহশীল পিতা, হে মমতাময়ী মাতা! আপনারা হয়তো মনে করেন, আপনারাই আদর্শ বাবা-মা; হয়তো আপনাদের মনে হয়, সন্তান প্রতিপালনে আপনারা পরিপূর্ণতা অর্জন করেছেন। কিন্তু একটু থামুন, একটু গভীরভাবে নিজেদের বাস্তবতাকে সত্যতার সঙ্গে পর্যালোচনা করুন হয়তো তখন আপনাদের ধারণা বদলে যাবে।
সন্তানদের আপনাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো না সীমাহীন সুরক্ষা, আর না-ই সীমাহীন ভোগ-বিলাস; বরং প্রয়োজন ভালোবাসা ও মর্যাদা, মমতা ও দৃঢ়তা, এবং অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য।
আপনার সন্তান যেন অনুভব করে যে আপনারা তাকে ভালোবাসেন এটি খুবই সুন্দর। তাকে আনন্দিত ও প্রফুল্ল দেখে আপনারা আনন্দিত হন এটিও চমত্কার। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই, যখন সন্তানের সামনে আপনাদের অবস্থান ও মর্যাদা হারিয়ে যায়। আপনাদের ন্যায়সংগত কর্তৃত্ব ও অভিভাবক হিসেবে দৃঢ় অবস্থান প্রকাশের মাধ্যমে আপনারা তাকে শেখান, কীভাবে নিজেকে ন্যায়সংগতভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। একই সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে কর্তৃত্ব ও নিয়মের প্রতি সম্মান গড়ে ওঠে ঘরে বাবা-মায়ের কর্তৃত্ব, বিদ্যালয়ে শিক্ষকের কর্তৃত্ব, সমাজে নিয়মের কর্তৃত্ব এবং জীবনে আইনের কর্তৃত্ব।
ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের অর্থের মূল্য শেখান। তাদের কেনাকাটার জোয়ারে ভাসিয়ে দেবেন না, বিজ্ঞাপনের প্রবল স্রোতের কাছে তাদের ইচ্ছাগুলোকে সমর্পণ করবেন না। অর্থ পরিশ্রম ছাড়া আসে না জীবিকা অর্জনের জন্য কপালের ঘাম ঝরাতে হয়, এ কথা আপনারাই সবচেয়ে ভালো জানেন। শিশুকে যদি সে যা চায়, যখন চায়, সবকিছু দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সে লোভ, অবহেলা এবং অমূল্যায়ন শিখবে। কিন্তু যদি সে অপেক্ষার আনন্দ অনুভব করে এবং প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষার পার্থক্য বুঝতে শেখে, তাহলে সে সম্পদ ও সামর্থ্য ব্যবস্থাপনার কেৌশল শিখবে এবং জীবনের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে।
সন্তানদের কাজ থেকে দূরে রাখবেন না, কাজটি যতই ছোট মনে হোক না কেন। কাজ তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে, স্বনির্ভর হতে শেখায় এবং পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার মানসিকতা গড়ে তোলে।
অতিরিক্ত সুরক্ষা অনেক সময় উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে। এতে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হতে পারে, যারা দেওয়া পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবে, কিন্তু বিনিময়ে কিছু দিতে চাইবে না; পরিশ্রম ছাড়া আরাম, চষ্টো ছাড়া সাফল্য এবং শ্রম ছাড়া জীবনযাপন করতে চাইবে। অথচ জীবন আপনারা যেমন জানেন মানুষ যতটা গ্রহণ করে, ততটাই দেয়।
সন্তানদের কৃতজ্ঞতার আনন্দ শেখান। তাদের শেখান বলতে ধন্যবাদ’, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন’, আপনি অনেক উপকার করেছেন’, আল্লাহ আপনার রিজিক ও কল্যাণ বাড়িয়ে দিন।’ এই ছোট ছোট কথাগুলো তাদের অন্তরে অন্যের সেবা ও সহযোগিতার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং যিনি উপকার করেন তার প্রতি সম্মান সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে এগুলো মানুষকে আরও উদার হতে, মানবিকতা ও মহত্ত্বের চর্চা করতে উত্সাহিত করবে এবং পরিবার ও সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করবে। তবে সাবধান! সন্তানদের সামনে কখনো স্বার্থপর বা অহংকারী হবেন না।
একজন শিশু তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে যে সবচেয়ে খারাপ বিষয়টি দেখতে পারে, তা হলো স্বার্থপরতা ও বোকামিপূর্ণ আচরণ। আপনারা আদর্শ আপনারা চান বা না চান, তবু। আপনাদের চোখের সামনে করা প্রতিটি কাজই তার শেখার একটি পাঠ; অনেক সময় কোনো বই বা উপদেশের চেয়েও আপনাদের আচরণ তার ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।
সন্তান প্রতিপালন কেবল মুখে বলা কিছু কথা নয়, কিংবা বইয়ে লেখা কিছু তত্ত্বও নয়; বরং এটি এমন কিছু বাস্তব মুহূর্ত, যা জীবন দিয়ে অনুভব করা হয়, এবং এমন কিছু আচরণ, যা বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয়।
তাই আপনারা সন্তানদের কাছে দায়িত্বশীলতার আদর্শ হয়ে উঠুন। যেন তারা বড় হয়ে আপনাদের মর্যাদা ও দৃঢ়তাকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে এবং মনে রাখে আপনারা তাদের মিথ্যা আরামের বিলাসিতায় ডুবিয়ে দেননি; বরং জীবনকে তার প্রকৃত বাস্তবতা, দায়িত্ব, পরিশ্রম ও সংগ্রামসহ কীভাবে বঁাচতে হয়, তা শিখিয়েছেন।

