লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলায় একটি পণ্যবাহী জাহাজের চার নাবিক নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ইয়েমেনের একটি হুতি-বিরোধী সামরিক গোষ্ঠীর দুই সদস্যও নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় ও কোস্ট গার্ড।
এদিকে, একই দিনে, ওমান উপসাগরে ইরানের একটি বন্দরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা একটি কনটেইনার জাহাজে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ফলে একদিনেই মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে জাহাজ চলাচল ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলার শিকার পণ্যবাহী জাহাজটির নাম ‘তিহামাহ’। জাহাজটি মিশরের মালিকানাধীন। এতে তিন পাকিস্তানি ও একজন ইন্দোনেশীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। হামলার পর জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন নাবিকেরা।
ইয়েমেনের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, হামলার পর উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হুতিরা আবারও জাহাজটিতে আঘাত হানে। এ সময় হুতি-বিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের (এনআরএফ) দুই উদ্ধারকর্মী নিহত হন।
এ ঘটনায় মোট ১০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে জাহাজটির সাতজন ক্রু, কোস্ট গার্ডের দুই সদস্য এবং এনআরএফের একজন সদস্য রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইয়েমেনের কোস্ট গার্ড।
হামলার ঘটনায় নিহতদের তথ্য নিশ্চিত হলে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুতি হামলায় এটিই হবে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) হুতিরা দাবি করে, তারা বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে সৌদি সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে তারা জাহাজটির নাম প্রকাশ করেনি।
হুতিদের এই দাবির বিষয়ে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ নৌবাহিনী-সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) মঙ্গলবার বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে একটি হামলার খবর জানায়। সংস্থাটি বলেছে, একটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হামলার শিকার জাহাজটি ‘তিহামাহ’—এটি নিশ্চিত করতে জাহাজটির ডেক ও মাস্তুলের আকৃতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্য জাহাজটির আগের আর্কাইভ করা ছবির সঙ্গে মিলে গেছে।
এছাড়া বন্দরের কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন দৃশ্যের সঙ্গে স্যাটেলাইট ছবি এবং ওই এলাকার ভূপ্রকৃতির মানচিত্রও মিলিয়ে দেখা হয়েছে। জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী তথ্য অনুযায়ী, ১১ আগস্ট ইয়েমেনের মুরাদের কাছে ‘তিহামাহ’ জাহাজটির অবস্থান ছিল।
ইয়েমেনের কোস্ট গার্ডের দুই কর্মকর্তা এবং দেশটির সরকারের দুই সামরিক কর্মকর্তা জাহাজটিতে হুতিদের হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রিও জানিয়েছে, ১১ আগস্ট জাহাজটিতে হামলা হয়েছে।
অ্যামব্রির তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় জাহাজটি ইয়েমেনের পেরিম দ্বীপের উত্তর-পূর্বে নোঙর করা অবস্থায় ছিল।
প্রসঙ্গত, লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে গত ২০ জুলাই ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করে হুতিরা। তাদের দাবি, ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে অবরোধ আরোপের জবাব হিসেবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে ইয়েমেনে কোনো ধরনের অবরোধ আরোপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে রিয়াদ।
লোহিত সাগর দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সময়ে ওমান উপসাগরে ইরানের বন্দরের দিকে যাওয়া একটি কনটেইনার জাহাজে মার্কিন হামলার খবর সামনে আসায় পুরো অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

