ক্যালেন্ডারের একটি নির্দিষ্ট দিনে কি থমকে যাবে মানবসভ্যতা? কোনো বিধ্বংসী পরমাণু যুদ্ধ, মহামারি কিংবা গ্রহাণুর আঘাত নয়; বরং পৃথিবীর ওপর চরম স্থান সংকটের কারণে পিষ্ট হয়ে বিলুপ্ত হবে কোটি কোটি মানুষ! প্রায় ছয় দশক আগে এমন এক রোমাঞ্চকর ও চমকপ্রদ পূর্বাভাস দিয়ে বিজ্ঞানবিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন অস্ট্রীয়-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী হেইঞ্জ ভন ফোরস্টার। গাণিতিক হিসাব কষে তাঁর দেওয়া সেই আলোচিত দিনটি ছিল ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর, শুক্রবার।
পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিনথ’ বা ১৩ তারিখের শুক্রবারকে অশুভ মানা হলেও ফোরস্টারের এই পূর্বাভাস কোনো লোককথা বা অলৌকিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়নি। বরং শত শত বছরের জনসংখ্যার তথ্য গাণিতিক মডেলে বিশ্লেষণ করেই তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। তবে প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে-বিজ্ঞানীদের নির্ধারিত সেই সময় তো দোরগোড়ায়, সত্যিই কি সেদিন কোনো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে পৃথিবীর জন্য?
১৯৬০-এর দশকে খ্যাতনামা গবেষণা সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের এই বিজ্ঞানী লিখেছিলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষুধায় মারা যাবে না, তারা একে অপরের চাপে নিষ্পেষিত হয়ে মারা যাবে।’
ফোরস্টারের দাবি ছিল, মানবজাতির জনসংখ্যা যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা অসীমের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় সৃষ্টি হবে চরম সামাজিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়। তৎকালীন সময়ে তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই সহস্রাব্দের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি পরীক্ষা করেন ফোরস্টার ও তাঁর দল। তাঁরা দেখেন, অতীতে যেখানে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হতে শত শত বছর লাগত, আধুনিক যুগে সেই সময়সীমা দ্রুত কমে আসছে। এই ধারার ওপর ভর করে তাঁরা গাণিতিক সমীকরণ তৈরি করে দেখান যে, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা ২ হাজার ৫০০ কোটিতে পৌঁছাবে এবং ২০২৬ সালের শেষ দিকে এসে বৃদ্ধির হার এমন এক বিন্দুতে ঠেকবে, যেখানে তাত্ত্বিকভাবে জনসংখ্যা হবে ‘অসীম’। আর এই অসম্ভব গাণিতিক পরিণতিকেই তিনি ‘ডুমসডে’ বা মহাপ্রলয় আখ্যা দেন।
সমালোচনা ও বাস্তবতার রূপরেখা
ফোরস্টারের এই গবেষণা সে সময় গণিতবিদ ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকদের বক্তব্য ছিল, এই মডেলে বাস্তব জীবনের বহু সংবেদনশীল উপাদান—যেমন সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, প্রজনন স্বাস্থ্যের পরিবর্তন কিংবা মানবদেহের জৈবিক সময়সীমাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
বাস্তব পরিস্থিতিও বিজ্ঞানীর সেই চরম পূর্বাভাসের সঙ্গে মেলেনি। ১৯৫৮ সালে যখন এই সমীক্ষা চালানো হয়, তখন বিশ্বের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০ কোটি। বর্তমানে তা ৮২০ কোটির ঘরে পৌঁছেছে। ফলে ফোরস্টারের প্রাক্কলন অনুযায়ী অসীম জনসংখ্যার যে আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবচিত্র তার চেয়ে বহুদূরে।
সতর্কবার্তা যেখানে এখনো প্রাসঙ্গিক
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হওয়া বা অসীম জনসংখ্যার চাপ সৃষ্টির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে করা এই গাণিতিক কসরতটি আধুনিক মানবজাতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছিল-পৃথিবীর সম্পদ সীমাহীন নয়।
বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-র ভয়াবহ রূপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত সম্পদ হ্রাসের প্রেক্ষাপটে ফোরস্টারের সেই পুরোনো গবেষণাটি পুনরায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে চর্চায় এসেছে। ১৩ নভেম্বরের প্রলয় এক কাল্পনিক হিসাব হলেও, পৃথিবীর সীমিত সক্ষমতার বিপরীতে অনিয়ন্ত্রিত ভূ-সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে তাঁর দূরদর্শী সতর্কবার্তা আজও সমভাবে চিন্তার খোরাক জোগায়।

