spot_img

প্রবল স্রোত, অন্ধকার আর কাদা—টানেলে ৯ দিন কীভাবে বেঁচে ছিলেন দুই নেপালি?

অবশ্যই পরুন

নেপালের আকস্মিক বন্যায় ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়ার পর ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে জীবিত ফিরেছেন জলবিদ্যুৎ কর্মকর্তা সঞ্জয় সাহ। টানেলের ভেতরে কাটানো সেই ভয়াবহ সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। একই অভিযানে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে কবির মহারজনকেও। তবে এখনও টানেলে আটকে থাকা কয়েক ডজন মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

৭২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে টানা ও কঠিন উদ্ধার অভিযানের পর শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে নেপালের আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে সঞ্জয় ও কবিরকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। দুজনকেই টানেলের প্রায় ৪০ মিটার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। তাদের জীবিত উদ্ধারের ঘটনায় টানেলের ভেতরে আটকে থাকা অন্যদেরও জীবিত থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সঞ্জয় নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের একজন মেকানিক্যাল ফোরম্যান। ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের কন্ট্রোল রুমে কাজ করেন তিনি। ২৬ আগস্ট দুর্ঘটনার দিনও দায়িত্বে ছিলেন।

টানেল থেকে বের হওয়ার পর প্রথমে কথা বলতে পারছিলেন না সঞ্জয়। কয়েক মিনিট পর ক্ষীণ কণ্ঠে তিনি জানান, ভেতরে আরও চার-পাঁচজন মানুষ থাকতে পারেন। এরপর তাকে নুওয়াকোটে নেপালি সেনাবাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নেয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তিনি টানেলের ভেতরে কাটানো নয় দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

সঞ্জয় বলেন, ‘টানেলের ভেতরে আটকে থাকার সময় আমি একটি মহামন্ত্র জপ করছিলাম’। তিনি বলেন, ‘আমি কন্ট্রোল রুমে কাজ করছিলাম। সবার জীবন রক্ষা করা ছিল আমার দায়িত্ব।’

সঞ্জয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর তিনি অন্যদের বের হতে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন। সবার শেষে বের হওয়ার চেষ্টা করায় শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই টানেলের বাইরে বের হতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক কর্মদিবসে কন্ট্রোল রুমে চার-পাঁচ বা ছয়জন থাকলেও দুর্ঘটনার সময় সেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন মানুষ ছিলেন। সবাইকে বের হওয়ার জন্য সতর্ক করেছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে আমি নিজেই বের হওয়ার সুযোগ হারাই।’

সঞ্জয়ের ধারণা, হয়তো সবাই টানেল থেকে বের হতে পারেননি। টানেলটি অনেক লম্বা হওয়ায় প্রবল পানির স্রোত ভেতরে থাকা মানুষদের আরও গভীরে নিয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।

পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা ২৬ আগস্ট সকালে

বিপর্যয়ের দিন ২৬ আগস্ট সকাল ৭টার দিকে পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেছিলেন সঞ্জয়। এরপর তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে।

তার বোন সুধা জানান, পরিবার থানায় নিখোঁজের রিপোর্ট করেছিল। সঞ্জয়ের বড় ভাই রসুয়ায় গিয়ে তিন দিন ধরে তাকে খুঁজেছিলেন। কিন্তু কোনো সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন।

সঞ্জয় বিবাহিত। তার আড়াই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। বন্যার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে তার পরিবার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটিয়েছে।

শুক্রবার এক স্বজন ফোন করে সঞ্জয়কে জীবিত উদ্ধারের খবর দেন। পরে তার একটি ছবিও পরিবারকে পাঠানো হয়। খবর পাওয়ার পর পরিবারের সবাই আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সঞ্জয়ের বাবা রামফল সাহ বলেন, তারা প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে ছিলেন। এখন ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আনন্দের কোনো সীমা নেই।

৯ দিন পর স্বামীকে জীবিত দেখে আনন্দে কাঁদলেন স্ত্রী

এদিকে কীর্তিপুরে হীরা শোভা শ্রেষ্ঠা প্রায় ১০ দিন ধরে স্বামী কবির মহারজনের অপেক্ষায় ছিলেন। শুক্রবার সকালে হঠাৎ টেলিভিশনের পর্দায় স্বামীকে টানেল থেকে জীবিত উদ্ধারের দৃশ্য দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনি।

হীরা শোভা বলেন, পর্দায় স্বামীর মুখ দেখে তারা বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। আনন্দে চোখে পানি চলে আসে।

কবির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজে কুলেখানি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পে গিয়েছিলেন। তিনি জলবিদ্যুৎ অটোমেশন প্রকল্পের অধীনে মেকানিক্যাল সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেন।

২৬ আগস্ট সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বন্যা আঘাত হানার প্রায় এক ঘণ্টা আগে স্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ কথা বলেন কবির। তিনি জানিয়েছিলেন, তারা নাশতা করছেন এবং কাজের জন্য ভূগর্ভে যাচ্ছেন। সেখানে মোবাইল ফোন কাজ নাও করতে পারে বলেও স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন তিনি।

এরপর বন্যার খবর পাওয়ার পর পরিবার কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তারা নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সদর দপ্তরে গিয়ে বিষয়টি জানান।

নয় দিন ধরে স্বামীর কোনো খবর না পেয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন হীরা শোভা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কবিরকে খুঁজে পাওয়ার আশায় পোস্টার ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে লেখা ছিল—‘আমরা এখনও অপেক্ষা করছি। আমরা এখনও আশাবাদী। আমরা এখনও প্রার্থনা করছি।’

কংক্রিটের স্ল্যাব ও কাঠের গুঁড়ির মধ্যে ছিলেন কবির

নেপালি সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরিচালিত উদ্ধার অভিযানে শুক্রবার সকালে সঞ্জয় ও কবিরকে উদ্ধার করা হয়। সকাল প্রায় ৯টার দিকে সঞ্জয় এবং ৯টা ২০ মিনিটের দিকে কবিরকে টানেল থেকে বের করা হয়।

উদ্ধারকারীরা জানান, সঞ্জয়কে পা ছড়িয়ে বসে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। আর কয়েক মিটার ভেতরে কংক্রিটের স্ল্যাব ও কাঠের গুঁড়ির মধ্যে আটকে ছিলেন কবির। উদ্ধারকারী দলের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল গঙ্গা বারাল জানান, কবিরকে যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তার শরীরে শুধু অন্তর্বাস ছিল। দু’জনকেই প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নুওয়াকোটের বিদুরে নেপালি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নেয়া হয়। পরে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর বীরেন্দ্র আর্মি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হীরা শোভা হাসপাতালে গিয়ে কবিরের সঙ্গে দেখা করেন। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা কবির পানি খেতে চাইলে তিনি তাকে পানি দেন। কবির মাথা নেড়ে স্ত্রীকে চিনতে পারার কথা জানান। তবে তখনও তিনি পুরোপুরি জ্ঞান ফিরে পাননি। তার একটি পা ভেঙে গেছে বলেও জানান হীরা শোভা।

জীবিত উদ্ধারে নতুন আশার সৃষ্টি

দু’জনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা টানেলে আটকে থাকা অন্যদের পরিবারের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। তবে একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তাও।

উদ্ধার অভিযানে যুক্ত ভূতাত্ত্বিক প্রকৌশলী উদয় নেউপানে জানান, বন্যার দুই দিন পর থেকেই উদ্ধারকারী দলগুলো টানেলের ভেতরে কাজ করছিল। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় ফাঁকা স্থান থাকায় সঞ্জয় ও কবির সেখানে কিছুটা এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতরে জীবিত দুই ব্যক্তি ও একটি মরদেহ ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাননি। ধসে পড়া কাঠামো, কাদা, মাটি ও পলিতে টানেলের বিভিন্ন অংশ চাপা পড়ে রয়েছে।

সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য অম্বর মহাত জানান, তার নেতৃত্বাধীন দল টানেলের বিভিন্ন অংশে অনুসন্ধান চালিয়েছে। কোথাও আর কোনো মানুষের কণ্ঠও তারা শুনতে পাননি।

উদ্ধারকারীরা জানান, প্রবল পানির স্রোতে টানেলের ওপরের শক্তিশালী কংক্রিটের আবরণও ধসে পড়েছে। ভূগর্ভস্থ পাওয়ারহাউসের বিশাল অংশ কাদা ও মাটিতে ঢেকে গেছে।

আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের প্রধান অভাস ওঝা জানান, সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী আর কিছু খুঁজে না পাওয়ায় উদ্ধার অভিযান বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে সম্ভাব্য স্থানগুলো আবারও পরিদর্শন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট।

সর্বশেষ সংবাদ

ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার হুমকি ট্রাম্পের

ইরানের সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ আঘাত হানবে মার্কিন বাহিনী। 'পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন'-এ কোনো তৎপরতা শনাক্ত হলে সেটি হামলার...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ