হিমালয়ের কোলঘেঁষা তিব্বতে ভয়াবহ বন্যা ও কাদাধসে ব্যাপক প্রাণহানি হলেও দুর্যোগের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে আসছে না। চীন প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
সীমান্তবর্তী গিরং বন্দরে বন্যার ভয়াবহ স্রোতের ভিডিও আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও চীনের সংবাদ মাধ্যমে এর খুব সামান্য অংশই প্রকাশিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নেপালের তুলনায় চীনের তিব্বত অংশে পরিস্থিতির তথ্য অনেক ধীরে সামনে আসছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে অঞ্চলটিতে তথ্যপ্রবাহের ওপর চীনা সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণকে উল্লেখ করা হচ্ছে।
হিমালয়ের সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ বন্যায় নেপাল ও চীনের তিব্বতের বহু গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালে ইতোমধ্যে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯ শতাধিক বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া আরও চার হাজার আড়াই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, একই সময় চীনের পক্ষ থেকে তিব্বতে মৃতের সংখ্যা মাত্র ১৬ জন এবং নিখোঁজ ৫৪৬ জন বলে জানানো হয়েছে। অথচ গিরং সীমান্ত ক্রসিংয়ের আশপাশের গ্রামগুলোতে কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করে।
নেপালে সাংবাদিকদের সরেজমিন অনুসন্ধান
নেপালে দুর্যোগের পরপরই সাংবাদিকেরা যতটা সম্ভব বিপর্যস্ত এলাকার কাছাকাছি পৌঁছে বেঁচে যাওয়া মানুষ, উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন।
বন্যার পানির তোড়ে ঘরবাড়ি ও জনপদ ভেসে যাওয়ার প্রত্যক্ষ বিবরণও দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিজ্ঞানীরা এখনও এই আকস্মিক বন্যার সঠিক কারণ নিয়ে গবেষণা করছেন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দুর্যোগটির ভয়াবহতার বিস্তারিত চিত্র দ্রুতই সামনে এসেছে।
অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বন্যা নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন ও সরাসরি সম্প্রচার করেছে এবং নিজেদের সাংবাদিকদেরও দুর্গত এলাকায় পাঠিয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিবেদনের মূল জোর ছিল উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের ওপর; বন্যায় কতটা ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলনামূলকভাবে কম প্রকাশ করা হয়েছে।
তিব্বতের একটি ত্রাণকেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত একটি প্রতিবেদনে সাংবাদিককে দেখা যায়, তার পেছনে বেশ কয়েকজন মানুষ বসে আছেন। কিন্তু তাদের কারও সঙ্গে কথা বলা হয়নি।
তিব্বতে তথ্যপ্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ
১৯৫০-এর দশকে চীনের নিয়ন্ত্রণে আসা তিব্বত দেশটির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর একটি।
তিব্বতে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবিতে অতীতে বিক্ষোভ হয়েছে। কিছু ঘটনায় তিব্বতিদের আত্মাহুতির ঘটনাও ঘটেছে। এসব আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদেরও তিব্বতে স্বাধীনভাবে যাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। সাধারণত সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত সফরের মাধ্যমেই বিদেশি সাংবাদিকদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক তিব্বতি পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত এবং বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ অত্যন্ত সীমিত। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার কারণেও তিব্বতিদের শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে বলে মানবাধিকারকর্মীরা দাবি করেন।
তিব্বতি ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর চীনা সরকারের নীতিরও দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও তিব্বতি অধিকারকর্মীরা।
এমন পরিস্থিতিতে তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক বন্যায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবকিছু জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখা হয়
লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ স্যাংয়ের মতে, তিব্বতকে ঘিরে সবকিছুই চীনে জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হয়।
তিনি বলেন, তিব্বত নিয়ে এমন কোনও তথ্য প্রকাশ বা প্রতিবেদন করার সুযোগ নেই, যা শীর্ষ পর্যায় থেকে অনুমোদিত নয়।
তার মতে, ঘটনাস্থলে কেউ নিজের চোখে আরও বেশি মরদেহ দেখলেও সরকারি হিসাবে সংখ্যা না বাড়ানো পর্যন্ত বেশি মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
এর ফলে দুর্গত তিব্বতি অঞ্চলে প্রকৃত হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
উদ্ধার তৎপরতার তথ্যও সীমিত
তথ্য নিয়ন্ত্রণের কারণে তিব্বতে চীনের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা সম্পর্কেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ চীনের জরুরি সেবা ব্যবস্থাপনা, যার মধ্যে পিপলস লিবারেশন আর্মিও রয়েছে, নেপালের তুলনায় অনেক বেশি সম্পদ ও সক্ষমতাসম্পন্ন।
বিপর্যস্ত সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি। অনেক জায়গায় পরিস্থিতি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে উদ্ধারকাজ চালাতে বিশেষায়িত দক্ষতা ও সরঞ্জাম প্রয়োজন।
চীন ইতোমধ্যে শত শত জরুরি সেবাকর্মীকে দুর্গত এলাকায় পাঠিয়েছে। কিন্তু তারা ঠিক কীভাবে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছেন এবং কত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য খুব কমই প্রকাশ করা হচ্ছে।
স্টিভ স্যাংয়ের মতে, নিজেদের উদ্ধার সক্ষমতা ও তৎপরতার ইতিবাচক দিক তুলে ধরার একটি সুযোগ চীন হারাচ্ছে।
তার ভাষায়, চীনের সমস্যাটি সক্ষমতার অভাব নয়; বরং তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতি তাদের প্রবল প্রবণতা। তাদের স্বাভাবিক প্রবণতাই হলো সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখা।
বিপর্যয়কে জাতীয় অগ্রাধিকার দিচ্ছে বেইজিং
তবে বন্যা মোকাবিলাকে চীন যে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, তা স্পষ্ট করতে দেশটির সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করে উদ্ধারকাজের নির্দেশনা দেন। তিনি চীন ও বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের সন্ধানে ‘সর্বাত্মক প্রচেষ্টা’ চালানোর আহ্বান জানান।
শি জিনপিং দুর্গত এলাকা পরিদর্শনের জন্য দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংকেও সেখানে পাঠিয়েছেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লি কিয়াং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে জোর দিয়ে বলেছেন, সাধারণ সম্পাদক শি জিনপিং দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন
চীনের পক্ষ থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হলেও হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে একই সীমান্ত অঞ্চলের নেপাল অংশে যখন সাংবাদিক, স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের বর্ণনার মাধ্যমে বিপর্যয়ের ব্যাপকতা দ্রুত সামনে আসছে, তখন তিব্বতের দিকের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট।
ফলে তিব্বতে প্রকৃত কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কতজন নিখোঁজ এবং কতটা অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুললেও তথ্যপ্রবাহের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতির স্বাধীন মূল্যায়নকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে বন্যার প্রকৃত মানবিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র জানতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও তথ্যের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি

