মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ‘ভেঙে ফেলার’ লক্ষ্যে অন্যান্য দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থানকে আরও কঠোর করার অংশ হিসেবে এ ঘোষণা দিয়েছে।
সোমবার রুবিও অভিযোগ করেন, আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘গুলি বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে নয়, তথাকথিত আন্তর্জাতিক আইনের শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করছে।’
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই আইসিসির সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিরোধ শুরু হয়। তখন আফগানিস্তানে মার্কিন
বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করায় আইসিসিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল–সংক্রান্ত তদন্তের কারণে আইসিসির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
তবে এবার পররাষ্ট্র দপ্তরের নেতৃত্বে পুরো সরকার থেকে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে এটি বিশ্বের দেশগুলোকে তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে এবং যারা যোগ দেবে না তাদের জন্য মার্কিন সহায়তা সম্ভাব্য হ্রাস করার হুমকি দিচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, যেসব দেশ মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভর করে আইসিসি-র মিথ্যা কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করতে অস্বীকার করবে, তারা খুব সম্ভব আরো কঠোর নজরদারির আওতায় আসবে।
একই দিনে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে রুবিও লেখেন, “সরকারের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করে এবং যেসব মিত্র আমাদের সঙ্গে একমত হবে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে আমরা ধাপে ধাপে আইসিসিকে ভেঙে ফেলব।
পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই কর্মকর্তা জানান, এসব পদক্ষেপের মধ্যে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, ভিসা বাতিল এবং আরো কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা করে, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে বা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধাভোগী, তাদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে যেন তারা মার্কিন কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যদের বিচারের বিষয়ে আইসিসির দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের নিবন্ধে রুবিও আরও অভিযোগ করেন, আইসিসি “বামপন্থী বেসরকারি সংস্থা, আত্মতুষ্ট বৈশ্বিকতাবাদী (গ্লোবালিস্ট) এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী তৃতীয় বিশ্বের কয়েকটি সরকারের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি এল সালভাদরে অভিবাসী বহিষ্কার এবং কথিত মাদক-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মার্কিন নৌ হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে—এমন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন। পাশাপাশি ডেমোক্রেসি ফর দ্য অ্যারাব ওয়ার্ল্ড নাউ (ডন) সংস্থার ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ তদন্তে আইসিসির প্রতি আহ্বানকেও নাকচ করেন।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কেবল সেইসব দেশের ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করতে পারে, যারা রোম সংবিধি (Rome Statute)-এর সদস্য। ২০০২ সালে এই চুক্তির মাধ্যমেই আইসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনো এই চুক্তি অনুমোদন (র্যাটিফাই) করেনি এবং মার্কিন ভূখণ্ডে সংঘটিত কোনো অপরাধের তদন্তও আদালত শুরু করেনি।
মানবাধিকারকর্মী কেনেথ রথ বলেন, “ট্রাম্প এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চান যাতে আইসিসির এখতিয়ার মেনে নেওয়া দেশগুলোর ভূখণ্ডে যুদ্ধাপরাধ করলেও তার কোনো জবাবদিহি না থাকে—মূল বিষয়টি সেটাই।”
তবে কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির এখতিয়ারকে স্বাগতও জানিয়েছিল। বিশেষ করে রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী ইউক্রেনে রাশিয়ার কথিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করলে তা তারা সমর্থন করেছিল।
আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের নেতৃত্বে প্রসিকিউটরের দপ্তর ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করে। যেহেতু ফিলিস্তিন আইসিসির এখতিয়ার মেনে নিয়েছে, তাই সেখানে তদন্ত পরিচালনার আইনি ভিত্তি রয়েছে। এই তদন্তের অংশ হিসেবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত।
দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় সপ্তাহের মাথায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে আইসিসির কর্মকাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে পরিচালিত “অবৈধ ও ভিত্তিহীন পদক্ষেপ” বলে আখ্যা দেন। একই সঙ্গে তিনি আদালতের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসেন প্রধান কৌঁসুলি করিম খান, তাঁর দুই উপপ্রধান এবং ছয়জন বিচারক। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল—ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাসদস্যদের কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত চালানো।
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ায়। এ সময় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে যুক্ত তিনটি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থার বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সর্বশেষ “আইসিসিকে ভেঙে ফেলা”-র অঙ্গীকার আদালতের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক এক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সম্ভবত আমরা দেখতে পাব, বিভিন্ন বিদেশি সরকারকে আইসিসির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। সাধারণত নিষেধাজ্ঞা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করে।”
ওই সাবেক কর্মকর্তা আরও বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন পুরো আইসিসির বিরুদ্ধেই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে—এমন গুঞ্জন রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “এতে মনে হচ্ছে ভেনেজুয়েলা বা অন্য কোথাও আইসিসি ভবিষ্যতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তা ঠেকাতে আগাম একটি অভিযান চালানো হচ্ছে।”
এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে, মার্কিন নাগরিকরা আইসিসির সঙ্গে কাজ করতে পারবেন না। একই সঙ্গে আদালতের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন করলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক আর্থিক জরিমানা কিংবা কারাদণ্ডের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মানবাধিকার সংস্থা ডনের অ্যাডভোকেসি পরিচালক রায়েদ জারার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘রুবিওর এই আক্রমণ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতিকেই প্রকাশ করে না, বরং ইউক্রেন থেকে সুদান পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত করে। এমনকি এটি নিজেই রোম সংবিধি অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রুবিও আসলে ইটের পর ইট খুলে আইসিসিকে নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে ওঠা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই ভেঙে দিচ্ছেন।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

