জলাতঙ্ক প্রতিরোধে প্রায় ২০ লাখ ডোজ টিকা আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে। চলতি মাসেই অনুমোদন পাওয়া গেলে টিকা আমদানি করা হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. শাহজামান খান বলেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে প্রায় ২০ লাখ ডোজ টিকা আমদানির অনুমতির সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বিষয়টি। চলতি মাসের মধ্যেই অনুমোদন পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, কুকুরের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক আকারে ‘ম্যাস ডগ ভ্যাক্সিনেশন’ (এমডিভি) কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি না হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে সারাদেশে কুকুরের টিকাদান (এমডিভি) কার্যক্রম চলমান ছিল। পরে কার্যক্রমটি বন্ধ থাকায় কুকুরের মধ্যে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সমস্যা দেখা দেয়।
এ অবস্থায় সরকারি অর্থায়নে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। আগামী জুলাই থেকে এর কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ঢাকা শহরের পোষা কুকুর ও বিড়ালকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া এবং বন্ধ্যাকরণ করা হবে।
শাহজামান খান বলেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নেওয়া নতুন প্রকল্পটি ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে। এর জন্য ৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়ায় এখনো কাজ শুরু হয়নি। শুধু টিকাদান নয়, বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভ্যাসেকটমি বা বন্ধ্যাকরণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মাধ্যমে কুকুরের বংশবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
এদিকে মে মাসে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ধুবনী বাজার গ্রামের ৫২ বছর বয়সী ফুল মিয়া, যিনি চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
গত ২২ এপ্রিল উপজেলার কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ী, কঞ্চিবাড়ী এবং পাশের ছাপড়হাটী ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় একটি বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে ১৪ জন আহত হয়।
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন মো. রফিকুজ্জামান সে সময় গণমাধ্যমকে বলেন, নিহতদের কামড়ের ঘটনা, পরবর্তী লক্ষণ এবং চিকিৎসা-ইতিহাস পর্যালোচনা করে ধারণা করা যায়, তারা জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
তিনি বলেন, একবার রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে বাঁচার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে। তবে সময়মতো ক্ষতস্থান পরিষ্কার না করা, মাথায় কামড়, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সংক্রান্ত সমস্যা কিংবা র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি) না পাওয়াও মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বাজার, সড়ক ও আবাসিক এলাকায় এসব কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
রাজধানীর পশ্চিম নাখালপাড়ার বাসিন্দা এবং একটি সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাহিদ হাসান খানও কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে কুকুর ও বিড়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ জনে। ২০২৫ সালে তা আরও বেড়ে হয় ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জন। আর ২০২৬ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫১ জন।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জলাতঙ্কে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই ১৯ জন মারা গেছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও পশুচিকিৎসক ডা. মো. রেজওয়ানুর হক বলেন, জলাতঙ্ক মূলত একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। সাধারণত আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল, খেকশিয়াল, বেজি বা বানরের কামড় কিংবা আঁচড়ের মাধ্যমে এ রোগের জীবাণু মানবদেহে প্রবেশ করে।
তিনি আরও বলেন, কোনো কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে বা আঁচড়ালে আক্রান্ত স্থান কমপক্ষে ১৫ মিনিট চলমান পানিতে কাপড় কাচার সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে। সাবানের ক্ষার র্যাবিস ভাইরাস ধ্বংসে অত্যন্ত কার্যকর। এরপর অ্যালকোহল বা আয়োডিন দ্রবণ দিয়ে ক্ষতস্থান জীবাণুমুক্ত করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নিতে হবে।
সূত্র:বাবাস

