মানবজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। পৃথিবীর সকল হারানো সম্পদ একদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব হলেও চলে যাওয়া সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই ইসলাম সময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং সময়ের যথাযথ ব্যবহারকে সফল জীবনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।’ (সুরা আসর, আয়াত : ১-২)
সময়ের এই গুরুত্ব উপলব্ধি করেই ইসলাম একটি স্বতন্ত্র বর্ষপঞ্জির প্রচলন করেছে, যা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বর্ষপঞ্জির নাম হিজরি সন। হিজরি সন কেবল দিন-মাস-বছরের হিসাব রাখার মাধ্যম নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ত্যাগ, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও সভ্যতার উত্থানের এক জীবন্ত দলিল।
হিজরি সনের উত্পত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
হিজরি সনের সূচনা ইসলামের ইতিহাসের এক মহান ও যুগান্তকারী ঘটনাকে কেন্দ্র করে। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত মানব ইতিহাসের অন্যতম তাত্পর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই হিজরতের মাধ্যমে ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপ লাভ করেছে।
এখানে একটি গভীর শিক্ষা নিহিত আছে : ইসলামী বর্ষপঞ্জির সূচনা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম বা ওফাতের বছর থেকে নয়; বরং হিজরত থেকে। এর মাধ্যমে মুসলমানদের শেখানো হয়েছে যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা, সত্যের বিজয় এবং জাতির পুনর্জাগরণ ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
হিজরত : আত্মত্যাগ ও পরিবর্তনের প্রতীক
হিজরত শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন নয়; বরং এটি ছিল ঈমান, আদর্শ ও সত্যের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম দ্বীনের স্বার্থে জন্মভূমি, সম্পদ ও আত্মীয়স্বজন ত্যাগ করেছিলেন।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছে, তারাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ২১৮)
হিজরি সন ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা
ইসলামের বহু গুরুত্বপূর্ণ বিধান ও ইবাদত হিজরি বর্ষপঞ্জির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। রমজানের রোজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, হজ, আশুরার রোজা, আরাফার দিবস, যাকাতের হিসাব এবং ইদ্দতের সময়কাল—সবকিছুই হিজরি সনের ওপর নির্ভরশীল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তা মানুষের এবং হজের সময় নির্ধারণের মাধ্যম।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৮৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘চাঁদ দেখে রোজা রাখো এবং চাঁদ দেখে রোজা ভঙ্গ করো।’ (সহিহ বুখারি) এ থেকে স্পষ্ট হয় যে ইসলামের সময়-ব্যবস্থা মূলত চান্দ্র বর্ষপঞ্জির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং হিজরি সন মুসলিম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মুসলমানরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পরিচয় সংকটের মুখোমুখী। আজ অনেক মুসলমান ইংরেজি সাল-তারিখ সম্পর্কে সচেতন হলেও হিজরি মাসগুলোর নাম এবং তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত নন। এটি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। হিজরি সন মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আমরা একটি বিশ্বজনীন মুসলিম উম্মাহর অংশ। আমাদের ইতিহাস ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদার ইতিহাস।
হিজরি সনের শিক্ষা
প্রতিটি নতুন হিজরি বছর আমাদের সামনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে—
প্রথমত, এটি আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়। গত বছরের কাজের হিসাব গ্রহণ করে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সুযোগ এনে দেয়।
দ্বিতীয়ত, এটি ত্যাগ ও কুরবানির শিক্ষা দেয়। হিজরতের ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মহত্ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ত্যাগ স্বীকার অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, এটি আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা দেয়। সাওর গুহায় অবস্থানকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর সঙ্গীকে বলেছিলেন, ‘চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আত-তাওবা, আয়াত : ৪০)
চতুর্থত, এটি আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুহাজির সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ পরিত্যাগ করে।’ (সহিহ বুখারি)
অর্থাত্ আজকের দিনে প্রকৃত হিজরত হলো মিথ্যা, দুর্নীতি, সুদ, মাদক, অন্যায় ও সকল গুনাহ থেকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে ফিরে আসা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়
হিজরি সনের গুরুত্ব ও তাত্পর্য নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আজ সময়ের দাবি। এজন্য পরিবার, মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজরি সনের প্রচলন বৃদ্ধি করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি নথিপত্রে হিজরি তারিখ ব্যবহারে উত্সাহ দিতে হবে। পাশাপাশি সন্তানদের ইসলামী ইতিহাস ও হিজরতের শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। হিজরি নববর্ষকে আনন্দ-উল্লাসের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে আত্মসমালোচনা, তাওবা, আত্মশুদ্ধি এবং নতুন সংকল্প গ্রহণের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
হিজরি সন কেবল একটি বর্ষপঞ্জি নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, আদর্শ ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ত্যাগ ছাড়া সফলতা আসে না, সংগ্রাম ছাড়া পরিবর্তন আসে না এবং আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া প্রকৃত বিজয় অর্জিত হয় না। নতুন হিজরি বছর আমাদের জীবনে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, নৈতিকতা ও দ্বীনি চেতনার নতুন জাগরণ সৃষ্টি করুক। হিজরতের মহান শিক্ষা ধারণ করে আমরা যদি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সত্য, ন্যায় ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবে হিজরি সনের প্রকৃত তাত্পর্য বাস্তবায়িত হবে।
লেখক : প্রভাষক (আরবি)
মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম ও
খতিব, হাজী মনসুর আলী জামে মসজিদ, শাকপুরা, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম।

