পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ওয়াশিংটনের হাত ছিল বলে নতুন এক তথ্যে দাবি করা হয়েছে। সে ঘটনার প্রায় চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক তদন্ত সংস্থা ‘ড্রপ সাইট’ একটি অত্যন্ত গোপন কূটনৈতিক তারবার্তা প্রকাশ করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছেন ডোনাল্ড লু।
পাকিস্তানে এই ধরনের কূটনৈতিক বার্তা সাধারণত ‘সাইফার’ নামে পরিচিত। ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ইমরান খান তার সরকারকে হটানোর পেছনে যে বিদেশি চক্রান্তের দাবি করে আসছিলেন, এই গোপন নথির মাধ্যমে তার সত্যতা মিলল।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওই কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে ভারত সফরে রয়েছেন, তাকে হিন্দুস্তান টাইমস সাক্ষাৎকার নেয়।
সাক্ষাৎকারে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার কথোপকথন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী জিজ্ঞেস করেন, ‘ইমরান খান মনে হচ্ছে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আপনার একটি কথোপকথন হয়েছিল এবং আপনি তাকে বলেছিলেন, যদি ইমরান খান অনাস্থা ভোটে টিকে যান, তাহলে পাকিস্তান সমস্যায় পড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ক্ষমা করবে না। এ বিষয়ে আপনার কোনো প্রতিক্রিয়া আছে?’
ইতোমধ্যে ‘আই-০৬৭৮’ কোড নম্বরের এই নথিতে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদ খান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডোনাল্ড লুর মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। ২০২২ সালের এপ্রিলে মেয়াদপূর্তির প্রায় দেড় বছর আগে ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সে বিষয়ে প্রশ্ন করে হিন্দুস্তান টাইমস।
ডোনাল্ড লু সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের পরিস্থিতির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং পাকিস্তানের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনকে সম্মান ও সমর্থন করি।’
তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এমন কোনো কথোপকথন সত্যিই হয়েছিল কি না। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তা আবারও প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে শুধু বলেন, ‘এই প্রশ্নে আমার বলার এটুকুই।’
অন্যদিকে, লুকে নিয়ে ইমরান খানের মন্তব্য সম্পর্কে ডনের এক প্রশ্নের জবাবে স্টেট ডিপার্টমেন্টের একজন মুখপাত্র সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যই পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘ওই অভিযোগের একেবারেই কোনো সত্যতা নেই।’
ফাঁসের ঘটনায় জানা গেছে, ইমরান খান অপসারিত হওয়ার ঠিক এক মাস আগে ওই গোপন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতের এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস ও ইকোনমিক টাইমসসহ একাধিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম এই খবরটি প্রকাশ করেছে।
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধে ইমরান খানের নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি ওয়াশিংটন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি এবং এতে তারা ইসলামাবাদের ওপর চরম অসন্তুষ্ট ছিল। ওই বার্তায় মার্কিন কর্মকর্তা ডোনাল্ড লু স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে ইসলামাবাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও উন্নত হতে পারে। নথিতে লুর বক্তব্য উল্লেখ করে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের ভোট সফল হলে ওয়াশিংটন অতীতের সবকিছু ক্ষমা করে দেবে।
সাবেক তারকা ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ইমরান খান দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিলেন যে, পাকিস্তানের শাসক পরিবর্তনের মূল কলকাঠি নেড়েছে ওয়াশিংটন। মূলত স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা এবং রাশিয়া-চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ না নেওয়ার কারণেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে এবং ইমরান খানের এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালে অনাস্থা ভোটে হেরে বিদায় নিতে বাধ্য হন ইমরান খান, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রথম ঘটনা ছিল। এর এক বছর পর ইমরান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলা করা হয় এবং তখন থেকেই তিনি কারাগারে বন্দি আছেন। এমনকি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগেও তার দল তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় এবং তাদের দলীয় প্রতীক ‘ক্রিকেট ব্যাট’ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
সূত্র: ডন

