১০ মে ২০২৬ (মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার) বিশ্ব মা দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য—Motherhood: Nurturing the Future with Love and Care অর্থাৎ ‘মাতৃত্ব : ভালোবাসা ও যত্নে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা’ প্রতিপাদ্যটি মায়েদের অবদান, ত্যাগ ও স্নেহকে স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে মায়েদের ভূমিকা তুলে ধরে।
নিঃশর্ত ত্যাগ ও ভালোবাসার ঠিকানা ‘মা’। প্রথম মানবী হাওয়া (আ.), ইমরানের স্ত্রী হান্না/হানা/হিন্দা, জাকারিয়া (আ.)-এর স্ত্রী আশা বিনতে ফাকুজ, মারিয়াম (আ.), ইবরাহিম (আ.)-এর দুই স্ত্রী বিবি সারা ও বিবি হাজেরা, পবিত্র কোরআনে বর্ণিত আজিজে মিসরের স্ত্রী, ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া, মুসা (আ.)-এর মাতা ইউকাবাদ, শোয়েবের (আ.) কন্যা সাফুরা, আইয়ুবের (আ.) স্ত্রী রহিমা, প্রিয় নবী (সা.)-এর স্ত্রীরা ‘উম্মাহাতুল মুমিনিন’সহ অসংখ্য মহীয়সী মাতৃত্বের মর্যাদাকে গৌরবের সর্বোচ্চ শিখরে মেলে ধরেছেন।
বড় পীর আবদুল কাদের জিলানি, কতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকি, শেখ ফরিদ গঞ্জেশোকর, বায়োজিদ বোস্তামি (রহ.) কামিলিয়াতের মাকামে পৌঁছেছেন তাঁদের মায়ের দোয়ায়।
ইসলাম মায়েদের মর্যাদা নিশ্চিত করেছে। পবিত্র কোরআনের ভাষায় ‘…মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন ও অতিকষ্টে প্রসব করেছেন এবং লালন-পালন করেছেন।’
(সুরা : আহকাফ, আয়াত : ১৫)
প্রিয় নবী (সা.)-এর কাছে এক সাহাবি জানতে চাইলেন আমার ওপর কার অধিকার সবচেয়ে বেশি? তিনি (সা.) বললেন, ‘তোমার মায়ের’। এভাবে তিনবার প্রশ্ন করলে তিনবারই তিনি উচ্চারণ করেন, মা। চতুর্থবার তিনি (সা.) উচ্চারণ করেন বাবা।
মা দিবসের সূচনা ১৯০৮ সালে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার এক স্কুলশিক্ষিকা অ্যানা জারভিস সেখানকার পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা দেখে মর্মাহত হয়ে মায়ের জন্য বিশেষ দিন পালনের কথা ভাবলেন। তাঁর সে ভাবনা বাস্তবায়নের আগেই ১৯০৫ সালের ৯ মে তিনি মারা গেলে তাঁর মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেন। বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে ১৯০৮ সালে তাঁর মা ফিলাডেলফিয়ার যে গির্জায় উপাসনা করতেন, সেখানে সব মাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মা দিবসের সূচনা করেন। ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মায়েদের জন্য উৎসর্গ করে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত ‘মা’ ডাকের শব্দগুলোর উচ্চারণগত সাদৃশ্য কিভাবে ঘটল তা এক বিরাট রহস্য।
বাংলাদেশেও মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালিত হয়। ‘মা’ শব্দটিতে যে আবেগ ও আত্মার সম্পর্ক লুকিয়ে আছে, তা কিছুটা হলেও কবি জসীমউদ্দীন তাঁর ‘পল্লী জননী’ কবিতায় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন :
‘…রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা,
করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা।
তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে…।
ছোট কুঁড়ে ঘর, বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু,
শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু…।’
তাজমহলের পাথরচাপা ইতিহাসের আড়ালে ঘুমাচ্ছেন এক মা, মাকড়সার মতো যিনি সন্তান জন্ম দিতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন! মমতাজ মহলের মৃত্যুর কারণ চৌদ্দতম সন্তানের জন্ম!
অনেক ক্ষেত্রে আমাদের মায়েরা সন্তানের জন্য সর্বস্ব লুটিয়ে দিয়েও নিদানের কালে বড়োই একা, অপাঙেক্তয়। অথচ করপোরেট কালচারে দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় উচ্চারিত :
‘মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
তিন ভুবনে নাই।
সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক
মাথার ‘পরে আজি,
অন্তরে মা থাকুন মম
ঝরুক স্নেহরাজি…’।
(কাজী কাদের নেওয়াজ)
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর

