বিপথগামী হলে সেখান থেকে ফিরে আসার জন্য তওবা করা আবশ্যক। সহজ ভাষায়, খারাপ থেকে ভালো পথে ফিরে আসাকে তওবা বলা হয়। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদারেরা, তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো, আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ (গুনাহ) মোচন করবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে ঝরনাসমূহ প্রবহমান।’ (সুরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৮)
অপর আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই যারা গোপন করে সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ ও হেদায়াত যা আমি নাযিল করেছি, কিতাবে মানুষের জন্য তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর, তাদের আল্লাহ লা’নত (অভিশাপ) করেন এবং লা’নতকারীগণও তাদের লা’নত করে। তারা ছাড়া যারা তওবা করেছে, শুধরে নিয়েছে এবং স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। অতএব, আমি তাদের তওবা কবুল করবো। আর আমি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৯-১৬০)
খোদ রাসুলুল্লাহ (সা.) ও নিষ্পাপ হওয়ার পরও দিনে ৭০ থেকে ১০০ বারের বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি- আল্লাহর কসম! আমি প্রত্যহ আল্লাহর কাছে সত্তরবারেরও বেশি ইস্তিগফার ও তওবা করে থাকি। (সহিহ বুখারি, ৫৮৬৮)
আল-আগার আল-মুযানী (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন- অবশ্য কখনো কখনো আমার ‘কলব’ (অন্তর) পর্দাবৃত হয় (অর্থাৎ, মানুষ হিসাবে দুনিয়ার কাজকর্মে লিপ্ত হওয়ার কারণে আল্লাহর জিকির থেকে গাফিল হওয়া) এবং আমি আল্লাহর নিকট দৈনিক ১০০ বার ইস্তিগফার করে থাকি।
অন্যদিকে বান্দা খাস মনে তওবা করলে মহান রাব্বুল আলামিনও খুশি হন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা বান্দার তওবার কারণে সেই লোকটির চাইতেও বেশি খুশি হন, যে লোকটি মরুভূমিতে তার উট হারিয়ে পরে তা আবারও পেয়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৭০)
এ ক্ষেত্রে বান্দর খাদ নিয়তে তওবা করা ও মহান রাব্বুল আলামিনের পরম করুণা ও ক্ষমার অন্যতম একটি নজির আবু সাঈদ সা’দ বিন মালিক বিন সিনান খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে পাওয়া যায়। যেখানে বান্দার পাহাড়সম গুনাহের পরও মহান রবের ক্ষমার অনন্য নজির উঠে এসেছে।
খোদ নবীজি (সা.) এ বিষয়ে সাহাবীদের জানিয়েছেন। হাদিসটি হলো- বনি ইসরাইলের যুগে এমন একজন মানুষ ছিল যে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছিল। জঘন্যতম এ অপরাধের পর পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি লোকদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম কে, সে বিষয়ে জানতে চাইল। তখন লোকেরা তাকে একজন খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর কথা বলল। এরপর ওই ব্যক্তি সেই খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর কাছে গিয়ে বলল যে, সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তওবা বা জঘন্যতম এই পাপ মোচনের কোনো সুযোগ আছে?
জবাবে ওই খ্রিস্টান সন্ন্যাসী বললেন, ‘না’। তার এমন উত্তরে ওই ব্যক্তি এতটাই রাগান্বিত হলেন যে তাকেও হত্যা করে মোট ১০০ জনকে হত্যা করে ফেললেন। এরপর আবারও ওই ব্যক্তি লোকেদের কাছে জানতে চাইল- পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম কে। এবারও তাকে আরেকজন আলেমের খোঁজ দেয়া হলো।
পরবর্তীতে লোকটি সেই আলেমের কাছে এসে আগের মতোই বলল- আমি ১০০ জন মানুষ খুন করেছি। আমার কি তওবা করার কোনো সুযোগ আছে? জবাবে ওই আলেম বললেন, ‘হ্যাঁ আছে! তাঁর (মহান আল্লাহ তা’আলা) ও তওবার মধ্যে কে বাধা সৃষ্টি করবে?’
এরপর ওই আলেম লোকটিকে একটি দেশে চলে যেতে বললেন এবং তাকে বললেন, ‘ওই দেশে এমন কিছু লোক আছে, যারা আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, ওই দেশ পাপের দেশ।’ সুতরাং, আলেমের কথামতো ওই ব্যক্তি সেই দেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন। তবে যখন সে মাঝ রাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যুর সময় চলে আসে।
ওই সময় তার দেহ থেকে রুহ (আত্মা) বের করার জন্য রহমত ও আযাব দুই ধরনের ফেরেশতাই সেখানে উপস্থিত হলেন। পরবর্তীতে কে তার রুহ বের করবে সেটি নিয়ে ফেরেশতাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হলো। ওই সময় রহমতের ফেরেশতারা বললেন, ‘এই ব্যক্তি তওবা করে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে।’ অন্যদিকে আযাবের ফেরেশতারা বললেন, ‘এই ব্যক্তি এখনো ভাল কাজ করেনি (এজন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)।’
এমন একটি অবস্থায় একজন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে সেখানে উপস্থিত হলেন। পরে ফেরেশতারা তাকে শালিস মানলেন (সঠিক বিচারের অধিকার দিলেন)। পরবর্তীতে মানুষরূপী ওই ফেরেশতা ফায়সালা দিলেন যে, ‘তোমরা দু’দেশের দূরত্ব মেপে দেখো (অর্থাৎ, এই ব্যক্তি যে এলাকা থেকে এসেছে, সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব মেপে দেখো)। এই দু’টির মধ্যে সে যেদিকে বেশি নিকটবর্তী হবে, সেটি তারই অন্তর্ভুক্ত হবে।’ এরপর ফেরেশতারা দূরত্ব মাপলেন এবং দেখা গেল- লোকটি যে ভালো দেশে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই দেশের বেশি নিকটবর্তী জায়গা পেলেন। অবশেষে রহমতের ফেরেশতারা তার জান কবজ করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২২৪)
মনে রাখতে হবে, মুমিনের কখনোই মহান রবের রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। কারণ, খোদ আল্লাহ তা’আলাও বান্দাকে নিজের রহমত ও অনুগ্রহের চাদরে ঢেকে রাখতে ভালোবাসেন। তাইতো তিনি পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত উন্মুক্ত করে দেন, তা আটকে রাখার কেউ নেই। আর তিনি যা আটকে রাখেন, তারপর তা ছাড়াবার কেউ নেই। আর তিনি পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ২)
এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো- মহান রাব্বুল আলামিন পরকালে সফলকামদের জন্য বেশিরভাগ রহমত সঞ্চিত রেখেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা’আলা রহমত সৃষ্টির দিন ১০০টি রহমত সৃষ্টি করেছেন। ৯৯টিই তিনি তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন এবং একটি রহমত সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে ছেড়ে দিয়েছেন। যদি কাফির আল্লাহর কাছে সুরক্ষিত রহমত সম্পর্কে জানে, তাহলে সে জান্নাত লাভ থেকে নিরাশ হবে না। আর মুমিন যদি আল্লাহর কাছে শাস্তি সম্পর্কে জানে, তাহলে সে জাহান্নাম থেকে বেপরোয়া হবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২৫)

