spot_img

চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে রেকর্ডসংখ্যক নেতা বহিষ্কার, অনুপস্থিতিও সর্বোচ্চ

অবশ্যই পরুন

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও শৃঙ্খলা জোরদারের অংশ হিসেবে চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে রেকর্ডসংখ্যক জ্যেষ্ঠ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সদস্যদের অনুপস্থিতির হার পৌঁছেছে মাও সে তুংয়ের পরবর্তী সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের নেতৃত্বে চলমান রাজনৈতিক শুদ্ধি অভিযান দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বেইজিংয়ে শেষ হয়েছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন (প্লেনাম)। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

অধিবেশনে ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বেইজিংয়ে দলটির ২১তম কংগ্রেস আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই কংগ্রেসে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সি চিন পিং আরও পাঁচ বছরের জন্য দলের নেতৃত্বে থাকার সুযোগ পেতে পারেন।

কেন্দ্রীয় কমিটির এক-চতুর্থাংশের বেশি সদস্য অনুপস্থিত

চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সংস্থা। ২০২২ সালে গঠিত এই কমিটিতে পূর্ণ ও বিকল্প সদস্য মিলিয়ে শুরুতে ছিলেন ৩৭৬ জন।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার প্রকাশিত বৈঠকের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, এবারের অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন ২৭৯ জন সদস্য। অর্থাৎ, মোট সদস্যের ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁদের অনেকেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বহিষ্কৃত হয়েছেন অথবা নেতৃত্বের পদ হারিয়েছেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাও সে তুংয়ের পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো বৈঠকে এত বেশি অনুপস্থিতির নজির নেই।

তবে দলীয় নেতৃত্ব এই পরিস্থিতিকে দুর্বলতা হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং কমিউনিস্ট পার্টির শৃঙ্খলা, ঐক্য এবং নিজেদের ভুল সংশোধনের সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের লাউ চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক কেরি ব্রাউন বলেন, দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কমিউনিস্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিভাজনের বিপরীতে চীন নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বাদ পড়ছেন শীর্ষ নেতারাও

২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আসছেন সি চিন পিং। তাঁর মতে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে একসময় দল ও রাষ্ট্রের পতন ঘটতে পারে।

এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই অভিযানে চীনের আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের লাখো মানুষ তদন্তের আওতায় এসেছেন। বাদ পড়েছেন সি চিন পিংয়ের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীসহ প্রভাবশালী অনেক নেতা।

বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে ৩৩ জন কর্মকর্তার দলীয় বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পলিটব্যুরো সদস্য মা শিংরুই ও ঝাং ইউশিয়া। এ ছাড়া সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক লিউ জিয়ানচাও এবং সাবেক শিল্পমন্ত্রী জিন ঝুয়াংলংও বহিষ্কৃত হয়েছেন।

বর্তমান নেতৃত্বের মেয়াদে দায়িত্বে থাকা পলিটব্যুরোর তিন সদস্যকে অপসারণ করা হয়েছে। ১৯৮০ সালের পর কোনো মেয়াদে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ।

লন্ডনের টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউটের চীনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ নীতিবিশ্লেষক রুবি ওসমানের মতে, সি চিন পিং দীর্ঘ মেয়াদে দলীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের অস্থিরতা মেনে নিতেও প্রস্তুত।

সামরিক নেতৃত্বেও বড় ধরনের রদবদল

চীনের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

২০২২ সালে দায়িত্ব নেওয়া সাত সদস্যের এই কমিশনের পাঁচজনই শুদ্ধি অভিযানে বাদ পড়েছেন। বর্তমানে কমিশনে রয়েছেন সি চিন পিং এবং ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং শেংমিন।

সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও দুর্নীতিবিরোধী তদারকির দায়িত্বে পরিচিত ঝাং শেংমিনকে এবারের অধিবেশনে পলিটব্যুরোর সদস্য করা হয়েছে।

সাধারণত কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যানরা পলিটব্যুরোর সদস্য হয়ে থাকেন। তবে ১৯৯৪ সালের পর কোনো মধ্যবর্তী মেয়াদের প্লেনামে এই সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থায় নতুন সদস্য যুক্ত করার ঘটনা ঘটেনি।

এই পরিবর্তন চীনের সামরিক বাহিনীতেও শুদ্ধি অভিযানের ব্যাপকতা তুলে ধরছে।

আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারেন সি চিন পিং

২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে অনুষ্ঠেয় ২১তম পার্টি কংগ্রেসকে সামনে রেখে চীনের নেতৃত্বে নতুন করে পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সি চিন পিং আরও পাঁচ বছর দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকতে পারেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতেও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হচ্ছে। পিপলস ডেইলি ও সিনহুয়ার সাম্প্রতিক সম্পাদকীয় ও মন্তব্যে সি চিন পিংকে কেন্দ্র করে দল ও জাতির ঐক্য শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে পরবর্তী প্রজন্মের নেতাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। কেরি ব্রাউনের মতে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টিতে প্রজন্মগত পরিবর্তন চলছে। তবে সি চিন পিংয়ের ঘনিষ্ঠ প্রবীণ নেতারা তরুণদের হাতে কতটা ক্ষমতা ছাড়তে আগ্রহী, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

এদিকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান বন্ধের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি দলটি। অধিবেশন শেষে প্রকাশিত বিবৃতিতে নতুন সমস্যা ও বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ওপর স্বাধীন বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ সীমিত হওয়ায় কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দলীয় অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা অভিযান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ধারাবাহিক বহিষ্কার ও শীর্ষ নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরির পর দলটি কীভাবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, তা এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

সূত্র: রয়টার্স

সর্বশেষ সংবাদ

ইউক্রেনের কাছে ৫০০ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্রের

ইউক্রেনের কাছে ৫০০টি অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের মোট মূল্য ২১০ কোটি ডলার। তবে এর...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ