দক্ষিণ কোরিয়ার সাংকংহে বিশ্ববিদ্যালয়ের (Sungkonghoe University) প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ইয়াসমিন আক্তার। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রেক্ষাপটে মানবপাচার, বাস্তুচ্যুতি ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা নিয়ে গবেষণা করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের Inter-Asia NGO Studies বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।
গত ১৩ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন সায়েন্স বিল্ডিংয়ের জন ডেলি হলে আয়োজিত ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে ইয়াসমিনের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ থেকে মোট ১৩ শিক্ষার্থী প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ইয়াসমিনকে General Graduate School-এর Inter-Asia NGO Studies বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে মোট ২৫৪ শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১৮৮ জন স্নাতক এবং ৬৬ জন স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট পর্যায়ের ডিগ্রিধারী। একই অনুষ্ঠানে একজন শিক্ষার্থী Chairman’s Award এবং পাঁচ শিক্ষার্থী Outstanding Thesis Award পান।
ইয়াসমিনের স্নাতকোত্তর গবেষণার শিরোনাম ‘Internal Colonies of Aid and Mobility: Human Trafficking within the Rohingya Refugee–Host Community Landscape of Cox’s Bazar’। গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ড. কিয়ং তে পার্ক।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনে মানবপাচারের ঝুঁকি কীভাবে তৈরি হয়, সেটিই ছিল গবেষণার অন্যতম মূল অনুসন্ধান। মানবপাচারকে শুধু অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখার বদলে এর সঙ্গে রাষ্ট্রহীনতা, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, চলাচলের সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দৈনন্দিন নিরাপত্তাহীনতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে গবেষণায়।
গবেষণার abstract অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতিতে মানবপাচার কীভাবে মানুষের জীবিকা, চলাচল ও প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রহীনতা, চলাচলের বিধিনিষেধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি মানুষের ঝুঁকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করে, সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, সীমিত অর্থনৈতিক সুযোগ এবং চলাচলের বিধিনিষেধের প্রেক্ষাপটে অনানুষ্ঠানিক বা অনিয়মিত অভিবাসন কখনো কখনো মানুষের কাছে কাজ, চলাচল বা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নিরাপদ ও বৈধ বিকল্পের অভাবে মানবপাচারের অভিজ্ঞতা তাই শুধু শোষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কিছু ক্ষেত্রে এটি মানুষের চলাচল, জীবিকার সুযোগ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা খোঁজার প্রচেষ্টার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, মানবপাচারের নেটওয়ার্ক অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা আগে অভিবাসন করেছেন এমন ব্যক্তিরা কখনো কখনো নিয়োগ বা যাত্রা সহজ করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। ফলে ভুক্তভোগী, মধ্যস্থতাকারী ও সহায়তাকারীর প্রচলিত বিভাজন সব সময় স্পষ্ট থাকে না।
রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাও গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উভয় জনগোষ্ঠীই বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হলেও আইনি অবস্থান, লিঙ্গ, বয়স এবং সম্পদে প্রবেশাধিকারের পার্থক্য তাদের অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকিকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। গবেষণায় নারী ও তরুণদের বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণাটিতে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে শুধু ‘ভুক্তভোগী’ বা ‘সহায়তাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী’ হিসেবে না দেখে তাঁদের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত, জীবিকার চাপ, নিরাপত্তাবোধ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আকাঙ্ক্ষার আলোকে তাঁদের অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
গবেষণাটিতে human security এবং structural violence—এই দুই তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করা হয়েছে। Human security-এর মাধ্যমে মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা, কল্যাণ ও দৈনন্দিন নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অন্যদিকে structural violence-এর ধারণা ব্যবহার করে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিহিত বৈষম্য কীভাবে অধিকার, সম্পদ, সুযোগ ও সুরক্ষায় অসম প্রবেশাধিকার তৈরি করে মানুষের ক্ষতি ও নিরাপত্তাহীনতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গবেষণার অন্যতম বক্তব্য হলো, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির প্রেক্ষাপটে মানবপাচারকে শুধু ব্যক্তি, পাচারকারী বা অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখলে সমস্যাটির পুরো চিত্র ধরা পড়ে না। বরং রাষ্ট্রহীনতা, চলাচলের সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনি ও রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং বৃহত্তর কাঠামোগত পরিস্থিতির সঙ্গে এসব ঝুঁকির সম্পর্কও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নিরাপদ চলাচল, কাজ এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যখন নিরাপদ ও বৈধ বিকল্পকে সীমিত করে দেওয়া কাঠামোগত পরিস্থিতির সংযোগ ঘটে, তখন মানবপাচারের ঝুঁকি তৈরি বা আরও গভীর হতে পারে।
গবেষণার উপসংহার অনুযায়ী, মানবপাচার মোকাবিলায় শুধু criminal justice বা আইন প্রয়োগকেন্দ্রিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। শোষণ প্রতিরোধের পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ, সামাজিক সুরক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং নিরাপদ চলাচলের পথ তৈরির বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে ইয়াসমিন আক্তার বলেন, “এ স্বীকৃতি আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং গর্বের। একই সঙ্গে এটি আমার দায়িত্বও বাড়িয়েছে। মানবপাচার কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি কঠিন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার একটি অংশ গবেষণার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করতে পারা আমার জন্য খুবই অর্থবহ।”
গবেষণার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, “একটি সামাজিক সমস্যাকে বুঝতে শুধু পরিসংখ্যান বা নীতিমালা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে জড়িত মানুষের অভিজ্ঞতা, তাদের দৈনন্দিন সংকট এবং তারা কেন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেন—সেগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়।”
ইয়াসমিন বলেন, ভবিষ্যতেও অভিবাসন, শরণার্থী, মানবিক শাসনব্যবস্থা এবং মানবনিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে চান তিনি।
ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন সাংকংহে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট কিম কিয়ং-মুন। পরিচিত বিষয়ে স্থির না থেকে কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে না যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরও শিক্ষক, সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায় শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন কিম কিয়ং-মুন।
সাংকংহে বিশ্ববিদ্যালয়ের Master of Arts in Inter-Asia NGO Studies (MAINS) একটি আন্তবিষয়ক, ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত স্নাতকোত্তর কর্মসূচি। ২০০৭ সালে চালু হওয়া এ কর্মসূচিতে এশিয়ার সামাজিক পরিবর্তন, এনজিও ও নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।

