স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে চাইলে খাদ্যতালিকা থেকে প্রথমেই বাদ দিতে হয় চিনি। অনেকেই চিনি বাদ দিতে গিয়ে কৃত্রিম চিনি খাওয়া শুরু করেন।
কৃত্রিম চিনি হিসেবে ব্যবহৃত জাইলিটল বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। জাইলিটল মূলত চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে জাইলিটলের মাত্রা যাদের বেশি ছিল, তাদের গুরুতর হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
জার্মানিতে, চলতি সপ্তাহে, অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজির (ইএসসি) কংগ্রেসে গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। এতে রক্তে বেশি মাত্রার জাইলিটলের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিকূল হৃদ্রোগজনিত ঘটনা বা মেজর অ্যাডভার্স কার্ডিওভাসকুলার ইভেন্টস-এর বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
জাইলিটল এক ধরনের সুগার অ্যালকোহল, যা কম ক্যালরির মিষ্টি এবং চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। খাবার, পানীয়, চুইংগামসহ বিভিন্ন পণ্যে মিষ্টি স্বাদ আনতে এটি ব্যবহার করা হয়। দাঁতের যত্নে ব্যবহৃত কিছু পণ্যেও জাইলিটলের উপস্থিতি রয়েছে।
গবেষণায় কানাডা ও যুক্তরাজ্যের ১৭ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকরা দুটি বড় গবেষণা দলের অংশগ্রহণকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করেন।
কানাডিয়ান লংগিচুডিনাল স্টাডি অন এজিংয়ের অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ছয় বছর পর্যবেক্ষণের পর দেখা যায়, রক্তে জাইলিটলের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকা ব্যক্তিদের হৃদ্রোগজনিত কারণে মৃত্যু, মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি সবচেয়ে কম মাত্রার জাইলিটল থাকা ব্যক্তিদের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, ইউরোপিয়ান প্রসপেক্টিভ ইনভেস্টিগেশন ইনটু ক্যানসার গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৩০ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। সেখানে রক্তে জাইলিটলের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকা ব্যক্তিদের বড় ধরনের হৃদ্রোগজনিত ঘটনার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে ১৮ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।
দুটি গবেষণা দলেই একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। অর্থাৎ, রক্তে জাইলিটলের ঘনত্ব যত বেড়েছে, হৃদ্রোগজনিত গুরুতর ঘটনা ঘটার হারও তত বেড়েছে। বয়স, লিঙ্গ, বডি মাস ইনডেক্স, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং রক্তে চর্বির মাত্রার মতো বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক বজায় ছিল।
গবেষণাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন চিনি কমানোর বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম মিষ্টির ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। গবেষণার উপস্থাপক ও জার্মানির বার্লিনের শারিতে ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের চিকিৎসক ড. মার্কো উইটকোভস্কির মতে, জাইলিটল নিয়ে আগের গবেষণাতেও রক্তের প্লেটলেটকে জমাট বাঁধতে বা রক্তে ক্লট তৈরিতে সহায়তা করার সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উঠে এসেছিল।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, কৃত্রিম চিনি সাধারণত এমন মানুষ বেশি ব্যবহার করেন, যারা এগুলোকে চিনির তুলনায় স্বাস্থ্যকর মনে করেন। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কাছেও এসব উপাদান সাধারণভাবে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত।
তবে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণে সাধারণ মানুষের মধ্যে পাওয়া ফলাফল জাইলিটলের হৃদ্যন্ত্রের নিরাপত্তা নিয়ে এখনও অনেক কিছু জানার বাকি রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যে জাইলিটলের ব্যবহার বাড়তে থাকায় এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গবেষণাটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি ছিল পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। ফলে রক্তে জাইলিটলের উচ্চ মাত্রাই যে সরাসরি হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা অন্য কোনো হৃদ্রোগজনিত ঘটনা ঘটিয়েছে, এমন কারণ-ফল সম্পর্ক এই গবেষণা প্রমাণ করে না। গবেষকরাও বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
এছাড়া রক্তে জাইলিটলের মাত্রা বেশি থাকার অর্থ ওই ব্যক্তি খাবার বা পানীয়ের মাধ্যমে বেশি পরিমাণে জাইলিটল গ্রহণ করেছেন, এটিও নিশ্চিত নয়। কারণ, খাবারের মাধ্যমে গ্রহণের পাশাপাশি গ্লুকোজ বিপাকের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও মানবদেহে জাইলিটল তৈরি হতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যকর্মী ড. আসিম মালহোত্রা গবেষণার ফলাফলকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, জাইলিটল কীভাবে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, এমন একটি সম্ভাব্য জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে গবেষণার ফলাফল মিলে যাওয়ায় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জাইলিটলযুক্ত সব পণ্য বা জাইলিটল গ্রহণের কারণে ব্যক্তিগতভাবে কারও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কতটা বাড়ে, তা নির্ধারণে আরও নির্ভরযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রয়োজন।

