কোয়ান্টাম কম্পিউটার এলে যে পাসওয়ার্ডই ব্যবহার করুন না কেনো, মিলি সেকেন্ডেই তা ভেঙে ফেলা সম্ভব বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম স্থপতি অধ্যাপক ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আইজ্যাক বেন-ইসরায়েল। বর্তমানে ব্যবহৃত সব ধরনের ডিজিটাল এনক্রিপশন বা তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে ‘অকার্যকর’ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটার পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছালে আজকের ব্যাংক, সরকার ও সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত এনক্রিপশন মুহূর্তেই ভেঙে ফেলা সম্ভব হবে।
তার ভাষ্য, ‘আপনি যে পাসওয়ার্ডই ব্যবহার করুন না কেন, মিলি সেকেন্ডের মধ্যেই আমি সেটি ভেঙে ফেলতে পারবো।’
কেন এত শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার?
সাধারণ কম্পিউটার ট্রানজিস্টরের সাহায্যে চলে, যেগুলোতে এক অথবা শূন্য থাকে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার এই সত্যকে কাজে লাগায় যে, একটি কণা একই সাথে দুটি অবস্থা বা দুটি স্থানে থাকতে পারে। বেন-ইসরায়েল ব্যাখ্যা করেন, এর অর্থ হলো, যে গণনা করতে একটি প্রচলিত যন্ত্রের এক বছর বা হাজার বছর সময় লাগত, কোয়ান্টাম কম্পিউটার তা প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে।
তার মতে, এটি প্রচলিত কম্পিউটারের তুলনায় শত বা হাজার গুণ নয়, বরং অকল্পনীয় মাত্রায় দ্রুতগতির প্রযুক্তি।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এনক্রিপশনে
তিনি বলেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটার হ্যাকারদের শুধু আরও দক্ষ করবে না; বরং বর্তমানে ব্যবহৃত এনক্রিপশন ব্যবস্থাকেই অকার্যকর করে দেবে।
ফলে একটি পাসওয়ার্ড ভাঙতে সম্ভাব্য সব ধরনের অক্ষর, সংখ্যা ও চিহ্ন একে একে পরীক্ষা করার যে প্রক্রিয়া, তা ভবিষ্যতে কয়েক মুহূর্তের ব্যাপার হয়ে যাবে।
সমাধান কী?
বেন-ইসরায়েলের মতে, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় দুটি পথ রয়েছে।
প্রথমটি হলো পোস্ট-কোয়ান্টাম এনক্রিপশন, যা নতুন ধরনের গাণিতিক অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যদিও এমন কিছু প্রযুক্তি ইতোমধ্যে রয়েছে, তবে সেগুলো ধীরগতির এবং এখনো ব্যাপক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠেনি।
দ্বিতীয় সমাধান হলো কোয়ান্টাম যোগাযোগ ব্যবস্থা। এতে কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে এমনভাবে তথ্য আদান-প্রদান করা হবে, যেখানে মাঝপথে কোনো সংকেত বা তার থাকবে না। ফলে তথ্য চুরি বা আড়ি পাতার সুযোগও থাকবে না।
তিনি জানান, চীন ইতোমধ্যে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি স্যাটেলাইট পরিচালনা করছে। একই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও কয়েক বছর আগে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে।
আর কতদিন?
বেন-ইসরায়েলের ধারণা, কোয়ান্টাম কম্পিউটারের প্রধান প্রযুক্তিগত বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে আরও প্রায় ১০ বছর লাগতে পারে।
তবে তিনি বলেন, এসব কম্পিউটার হবে বিশাল আকারের, অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় পরিচালিত এবং বিপুল বিদ্যুৎনির্ভর। তাই ভবিষ্যতেও এগুলো ব্যক্তিগত ব্যবহারের কম্পিউটার হবে না।
তার ভাষায়, ‘পৃথিবীতে হয়তো হাতে গোনা কয়েকটি কোয়ান্টাম কম্পিউটারই থাকবে। এগুলো ডেস্কে রেখে ব্যবহারের মতো যন্ত্র নয়।’
সাইবার যুদ্ধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
সাক্ষাৎকারে বেন-ইসরায়েল দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে সাইবার প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে।
তার মতে, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র শনাক্ত করা এবং হামলার আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো কাজ এআই কয়েক সেকেন্ডেই করতে পারে, যা মানুষের পক্ষে করতে হাজারো বিশ্লেষকের বহু বছর সময় লাগত।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে সাইবার প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

