সপ্তাহব্যাপী লাখো মানুষের অংশগ্রহণে ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির ঐতিহাসিক শোকযাত্রা ও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। এই কিংবদন্তিকে তারই জন্মশহর এবং দেশটির পবিত্রতম ধর্মীয় স্থান মাশহাদে আজ বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) দুপুরে অষ্টম শিয়া ইমাম ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজারে দাফন করা হয়েছে।
শেষ বিদায় জানাতে ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শোকাহত মানুষ মাশহাদে সমবেত হন। বিপুল জনসমাগম এবং ইরাকে বিদায় অনুষ্ঠানের সময় বারবার যাত্রা থেমে যাওয়ায় নির্ধারিত সময় পরিবর্তন করে স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় ইমাম রেজা স্ট্রিট থেকে জানাজার শোভাযাত্রা শুরু হয়।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল থেকে হাজারো মানুষ মাশহাদের রাস্তায় নেমে ইরানের পতাকা, খামেনির ছবি এবং বিপ্লবী স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এছাড়াও মাশহাদের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের অতিথিরাও অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নাইজেরিয়ার শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা শেখ ইব্রাহিম জাকজাকি।
এর আগে ইরাকে নজিরবিহীন শোকযাত্রার আয়োজন করা হয়। দেশটির নাজাফে রয়েছে প্রথম শিয়া ইমাম হযরত আলী (আ.)-এর পবিত্র মাজার। আর কারবালায় রয়েছে তৃতীয় শিয়া ইমাম হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও তার ভাই হযরত আব্বাস (আ.)-এর পবিত্র মাজার।
ইরাকি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নাজাফে হজরত আলী (আ.)-এর পবিত্র মাজার ঘিরে প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে আরবাঈন রুট হয়ে মরদেহ কারবালায় নেওয়া হয়। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যদের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ৩ জুলাই। ওই অনুষ্ঠানে বিশ্বের ৪৫টির বেশি দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং ৯০টিরও বেশি দেশের আলেম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধা জানান।
৪ ও ৫ জুলাই তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। ৬ জুলাই তেহরানে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে জানাজা ও শোকযাত্রা হয়। ৭ জুলাই কোমের জামকারান মসজিদে এবং ৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। গেল ২৮ ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় প্রাণ হারালেও আজও প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় একতার নাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
এদিকে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে আসেননি। ইরানি সূত্রের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তার মুখমণ্ডল বিকৃত ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর জখম হয়। তিনি চিকিৎসাধীন থাকায় এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে এখনো প্রকাশ্যে উপস্থিত হচ্ছেন না। তবে তিনি লিখিত বার্তা দিলেও তার কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও প্রকাশ করা হয়নি।
আধুনিক ইরানের কিংবদন্তি এই নেতার জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল, মাশহাদ শহরের এক ধর্মীয় পরিবারে। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় তিনি এই শহরে কাটিয়েছেন। এখানকার ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পর তিনি উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য কোমে যান। কৈশোর পেড়িয়ে যৌবনে পাড়ি দেওয়ার সময় ষাট ও সত্তরের দশকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনবিরোধী গোপন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন খামেনি। একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, সয়েছেন বহু নির্যাতন।
১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পতন হয় শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির। নতুন শাসনব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করেন খামেনি। এ সময় ইসলামী বিপ্লবী পরিষদের সদস্য, উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮১ সালে হত্যার চেষ্টা করা হলে বোমা বিস্ফোরণে খামেনির ডান হাত স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। সে বছরই আগস্টে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজায়ী নিহত হলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করেন খামেনি। ১৯৮৯ সালে ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ছিল ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত আয়াতুল্লাহ মনতাজেরিকে শেষ মুহূর্তে বাতিল করে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

