বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সুশাসন, রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, দেশীয় শিল্পায়ন এবং জলবায়ু-সহনশীল উন্নয়নে কার্যকর বিনিয়োগ ও কাঠামোগত সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ কথা বলেন| ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য সচিব এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার জন্যে ডিরেগুলেশনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ড্যাশবোর্ড চালু করা হচ্ছে, যাতে করে প্রতিটি প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা দেখে প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিএসইসি পুনর্গঠন করা হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়িয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে, যাতে করে একটি টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, “যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি লুটতরাজ-ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কাঠামোতে রূপান্তরিত হবে, তততিন পর্যন্ত যত সুন্দর বাজেট ও পলিসি গ্রহণ করি না কেন আমরা খুব সফল হতে পারব না।’ তিনি বলেন, স্বাধীনতাপরবর্তী গত ৫৪ বছরে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের জন্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে লুটপাট, দুর্নীতি ও রেন্ট-সিকিং নির্ভর অর্থনীতি। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি উৎপাদনশীল বা প্রোডাকটিভ অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক তার ‘সামষ্টিক অর্থনীতি ও বাজেটের সামগ্রিক চিত্র’ শীর্ষক প্রবন্ধে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, পুনরুদ্ধার এবং রূপান্তরের ওপর জোর দিয়ে বলেন, আগামী বাজেটের ৬.৫ শতাংশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঘরোয়া চাহিদার শক্তিশালী পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। কারণ রাজস্ব আহরণই এখন ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক কাঠামোর সবচেয়ে দুর্বল ভিত্তি। এক বছরে ৪৭ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধ নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাজস্ব স্থান সংকুচিত করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ তার ‘উন্নয়ন কৌশল ও বিনিয়োগ পরিবেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজারকে আরও গতিশীল করা না গেলে বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়বে না। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া বাজেটের কোনো ঘোষণাই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রমাণভিত্তিক গবেষণার আলোকে কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই।
বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা অর্থনীতিতে বৈষম্যের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধিই লক্ষ্য নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে তা দেখা জরুরি।
বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড. অতনু রব্বানী বলেন, এক বছরে বাজেট দ্বিগুণ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা একই থাকায় তা ব্যয়যোগ্য হবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা থেকে প্রতিরোধমূলক সেবার দিকে নজর দেওয়া ইতিবাচক, কিন্তু আউট-অফ-পকেট খরচ কমাতে হলে জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা চালু করতে হবে। ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা ‘শিক্ষা ও শ্রমবাজার: জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭’ প্রবন্ধে বলেন, এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল শিক্ষা, বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, সৃজনশীল অর্থনীতি ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যুব বেকারত্ব, দক্ষতার অমিল এবং নারীদের কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা দূর করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শারমিন্দ নীলোর্মি তার ‘জেন্ডার বাজেট ২০২৬-২৭: পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, বাজেটে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতা নিশ্চিত করতে ৪৪টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জিডিপির ৪.৮ শতাংশ অর্থাৎ মোট বাজেটের ৩৪ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল যথাক্রমে ৫.২৩ এবং ৩৪.৩৭ শতাংশ। বরাদ্দ কমানো হলেও ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মাধ্যমে ৪১ লক্ষ নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা প্রদান এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নারী কৃষকদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা সাধুবাদযোগ্য।
বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল ‘বাংলাদেশের শিল্পায়ন কৌশলের পুনর্গঠন: শিল্প উন্নয়নে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার’ শীর্ষক প্রবন্ধে প্রস্তাব করেন, সরকারি বাজেটে বাস ক্রয়ে ৪০ শতাংশ দেশীয় উপাদান ব্যবহারের শর্ত আরোপ করলে তা দেশীয় শিল্পের জন্য একটি বিশাল ও নিশ্চিত বাজার তৈরি করবে, যা কর ছাড়ের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম তার ‘সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন: প্রান্তিক, দরিদ্র ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ প্রবন্ধে বলেন, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তায় ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ২৫টি মন্ত্রণালয়ের ৯০টি কর্মসূচির এই বিশাল বরাদ্দ খণ্ডিত ব্যবস্থার কারণে সঠিক লক্ষ্যগ্রহণে ব্যর্থ হতে পারে।
সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন আইসিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ টি এম নূরুল আমিন এবং বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ)।
প্যানেল আলোচনায় তারা বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও পুঁজিবাজারে সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে ডিজিটাল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং কৃষক কার্ডের সঠিক ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন জরুরি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সুবিধাভোগী নির্বাচনে প্রক্সি মিনস টেস্ট এবং ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রির মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনতে হবে, যাতে তৃণমূল পর্যন্ত সঠিক ব্যক্তির কাছে সহায়তা পৌঁছায়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তা ছাড়া দেশীয় শিল্পায়নকে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রকে কেবল কর ছাড় না দিয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্টের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনের জন্য নিশ্চিত বাজার তৈরি করতে হবে এবং ‘লোকাল কন্টেন্ট’ নীতি কৌশলগতভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দেন।

