এবার মহাকাশে তিন নভোচারী পাঠিয়েছে চীন। চাঁদে মানুষ পাঠানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই পথে হাঁটল দেশটি। ‘শেনঝৌ-২৩’ মিশনের মাধ্যমে দেশটি জানতে চায়, দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে মানুষের শরীর ও মানসিক অবস্থায় কী ধরনের প্রভাব পড়ে। এই মিশনের একজন নভোচারী টানা এক বছর মহাকাশে থাকবেন। আর এর মাধ্যমে এটি হবে চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মানব মহাকাশ অভিযান।
সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিম চীনের জিউকুয়ান উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে লং মার্চ রকেটের মাধ্যমে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় শেনঝৌ-২৩ মহাকাশযান। এতে ছিলেন কমান্ডার ঝু ইয়াংঝু, পাইলট ঝ্যাং ঝিইউয়ান এবং পেলোড বিশেষজ্ঞ লি জিয়াইং। লি জিয়াইং হলেন হংকং থেকে মহাকাশে যাওয়া প্রথম নভোচারী।
রকেটে করে তিন নভোচারী চীনের মহাকাশ স্টেশন তিয়াংগংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এই মিশনের একজন নভোচারী টানা এক বছর কক্ষপথে অবস্থান করবেন। এটি হবে চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মানব মহাকাশ মিশন।
মহাকাশে কী করবেন চীনের নভোচারীরা?
শেনঝৌ-২৩ মিশনের মূল উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। নভোচারীরা দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকলে মানুষের শরীর ও মানসিক অবস্থা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা পর্যবেক্ষণ করবেন। এছাড়া দীর্ঘ সময় ভারশূন্য পরিবেশে থাকলে হাড়, পেশি, হৃদযন্ত্র এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব পড়ে।
বিজ্ঞানীরা এসব পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন, যাতে ভবিষ্যতের নভোচারীদের সুস্থ রাখার উপায় বের করা যায়। এছাড়া নভোচারীরা নতুন প্রযুক্তিও পরীক্ষা করবেন। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় ডকিং প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে মহাকাশযান মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই মহাকাশ স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
ভবিষ্যতের জটিল মহাকাশ অভিযানের জন্য এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি মহাকাশে তারা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাও চালাবেন। এর মধ্যে ভারশূন্য পরিবেশে মানব ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশ নিয়ে গবেষণাও রয়েছে।
চীনের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন তিয়াংগং ২০২২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি মূলত একটি ভাসমান গবেষণাগার, যেখানে নভোচারীরা কয়েক মাস ধরে অবস্থান করে কাজ করেন। বর্তমান মিশনটি সেই অভিজ্ঞতারই ধারাবাহিকতা।
চাঁদে মানুষ পাঠাতে চায় চীন?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের মহাকাশ কর্মসূচি দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। ২০০৩ সালে প্রথম নভোচারীকে মহাকাশে পাঠানোর পর দেশটি নির্ভরযোগ্য রকেট, নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন এবং নিয়মিত মানববাহী মিশন পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এখন তারা দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ ভ্রমণ ও গভীর মহাকাশ অনুসন্ধানে মনোযোগ দিচ্ছে। তিয়াংগংয়ে এক বছরের অবস্থান থেকে বিকিরণ, শারীরিক সক্ষমতা ও মহাকাশে দৈনন্দিন জীবনযাপন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
চাঁদে যাওয়া-আসার অভিযানে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং ভবিষ্যতের মিশনগুলো আরও দীর্ঘ হতে পারে। তাই এসব তথ্য ভবিষ্যতের নিরাপদ মহাকাশ অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে হংকংসহ চীনের অনেক মানুষের কাছে লি জিয়াইংয়ের এই যাত্রা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ এখন যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মহাকাশ অভিযানে অংশ নেয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তার অংশগ্রহণ সেটিই দেখাচ্ছে।
এছাড়া নভোচারীদের এই মিশন থেকে আরও বড় কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। আর তা হচ্ছে— মানুষ কতদিন মহাকাশে সুস্থ থাকতে পারে এবং চাঁদে পা রাখার আগে আর কী জানা প্রয়োজন। শেনঝৌ-২৩ মিশনের মাধ্যমে চীন ধীরে ধীরে সেই উত্তরগুলোই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

