হজ্জ। মানুষের বস্তুবাদী স্বাধীনতা থেকে ফিরিয়ে প্রকৃত দাসত্বের অনুভূতি জাগ্রত করে। এই যে মানুষ ফ্রি ইন্ডিভিজুয়াল নামক পুথিগত জিবনব্যবস্থার বুলি আউড়ায়,তাদের এসব ফ্রিডম ভেঙ্গে হজ্জ মনে করিয়ে দেয় আমরা একজনের দাস। তাইতো ইবরাহিমি আহ্বানে সাড়া দেয়া ব্যক্তি গুলো নিজেদের সবটুকু নিঃস্বতা নিয়ে সেই মনিবের ডাকে এক শুভ্র পোষাক ও একটি মাত্র বাক্য লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক বলতে বলতে উপস্থিত হয়।
হজ্বের দৃশ্যপটে সবচেয়ে নীরব ও গভীর শিক্ষা বহন করে যে দৃশ্যটি তা হলো; ইহরামের সাদা কাপড়। দুই টুকরো সাদা কাপড়; কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে জীবন, মৃত্যু, সমতা, বিনয় এবং আল্লাহর সামনে নিঃস্বতার পূর্ণ ঘোষণা। মানুষ যখন ইহরাম পরিধান করে, তখন সে শুধু পোশাক বদলায় না বরং সে নিজের পরিচয়, অহংকার ও দাম্ভিকতার অসামাজিক মুখোশও পরিবর্তন করে ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ ۚ فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ
হজ্ব নির্দিষ্ট মাসসমূহে অনুষ্ঠিত হয়, যে ব্যক্তি তাতে হজ্বকে ফরজ করে নেয়, সে যেন অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া থেকে বিরত থাকে। (সুরা আল-বাকারা: ১৯৭)। এই আয়াত বাহ্যিক পোশাক পরিবর্তনের সাথে সাথে অন্তরের ভেতর পুষে রাখা আত্ম-অহমিকা, হিংসা, দুনিয়ার লোভ ও মহাপ্রত্যাশার পোশাকও পরিবর্তন করে পরোপকারী ও অল্পেতুষ্টির সফেদ পোষাক পরিধানের তালিম দেয়।
ইহরাম এমন এক পোশাক যেখানে রাজা ও শ্রমিক একই কাতারে, ধনী ও দরিদ্র একই রঙে, নেতা ও সাধারণ মানুষ একই পরিচয়ে।
এই অসাধারন দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় রাসুল (সা.)এর বিদায় হজ্বের সেই ঐতিহাসিক বানী, لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى عَجَمِيٍّ وَلَا لِعَجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ إِلَّا بِالتَّقْوَى
কোনো আরবের উপর অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই, এবং কোনো অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই—শুধু তাকওয়া ছাড়া। (মুসনাদ আহমদ, ২৩৪৮৯)
ইহরাম এই হাদিসের বাস্তব চিত্র ও জীবন্ত ঘোষণা যে, মানুষের মর্যাদা রঙে নয়, বংশে নয়, জাতীয়তায় নয়, ধন-দৌলতে নয়, মর্যাদা কেবলমাত্র তাকওয়ায়।
ইহরামের কাপড়, কাফন সাদৃশ্য হওয়ায় এটি আমাদের জিবনের শেষ পোষাকের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই সাদৃশ্য কোনো কাকতালীয় নয়,বরং দুনিয়ার মোহ কাটিয়ে কবরের কথা স্বরন করিয়ে দেয়ার এটি এক গভীর শিক্ষা। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, হজ্ব মানুষকে মৃত্যুর স্মরণ করিয়ে দেয়, যেন সে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হয়।
রাসুল (সা.)বলেন, الْمُحْرِمُ لَا يَلْبَسُ القَمِيصَ وَلَا السَّرَاوِيلَ وَلَا البُرْنُسَ মুহরিম ব্যক্তি জামা, পায়জামা ও মাথা ঢাকা পোশাক পরবে না। (বুখারি, ৩৫৯)
এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়,কোটি টাকার মালিক হওয়া সত্বেও আমার জন্য সেই পোষাক, একজন সাধারনের জন্য যে পোষাক। কই, আমার জন্য তো কোনো রাজকীয় পোষাক নেই। আমি তো অনেক উচ্চ পদধারী, আমার জন্য তো কোনো আসন বা প্রটোকল নেই। হ্যা এটাই দাসত্বের অনুভুতি, এটাই কবরের প্রস্ততি ।
আরো পড়ুন: যুবকদের অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরানো সম্ভব! করণীয় কী?
এই সাদা সেলাই বিহীন কাপড় আমাদের শেখায় বিলাসিতা কমাতে, আত্মাকে শুদ্ধ করতে, আল্লাহর সামনে বিনয়ী হতে, নিজেকে কিছুই না মনে করতে। হজ্জের এই দৃশ্যগুলো পৃথিবীর যেকোনো রাজদরবারের দৃশ্য থেকে আলাদা করে বলে দেয়, এটা কেবলই আমার রবের দরবার, যিনি এক ও একক, দাসত্ব কেবল তারই হতে পারে,তিনি আমার মনিব,আমি একমাত্র তারই গোলাম, অন্য কারো নই, কোনো ব্যাক্তি বা শক্তির নই ।
তাই ইহরাম সমস্ত গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্ত হয়ে, এক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করার প্রথম ধাপ, যেমনটা ইবরাহিম (আ.) বলেছিলেন, إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ ۖ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
যখন তার রব তাকে বললেন, আত্মসমর্পণ কর; তিনি বললেন, আমি বিশ্বজগতের রবের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। (সুরা আল-বাকারা: ১৩১)
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, হজ্বের উদ্দেশ্য হলো হৃদয়কে আল্লাহ ছাড়া সবকিছুর দাসত্ব থেকে মুক্ত করা।
আজকের মানুষ, নিজেকে আলাদা রাখতে চায়, নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় ভাবতে চায়, পোশাক ও স্ট্যাটাস দিয়ে পরিচয় দিতে চায়, ক্ষমতার দাপুটে পরিবেশ তৈরী করে আনন্দ পায়। তুমি শুধু একজন মানুষ, তোমার আসল পরিচয় আল্লাহর গোলাম, অহংকার নয়, বিনয়ই তোমার সৌন্দর্য। হজ্জ সেই আমল যা পৃথীবির সমস্ত ব্যক্তি, শক্তি, রাষ্ট্র এবং তন্ত্র-মন্ত্রের গোলামীর শৃংখল থেকে মুক্ত হয়ে এক স্রষ্টার গোলামীর প্রশিক্ষণ দেয়।
লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস জামিয়া ইমাম বুখারী,উত্তরা,ঢাকা।

