মহান আল্লাহর আছে সুন্দর সুন্দর নাম। নামগুলো তিনি নিজের জন্য মনোনীত করেছেন, যা আল্লাহর কিতাব ও নবী (সা.)-এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের চারটি আয়াতে এ নামগুলোকে ‘আল-আসমাউল হুসনা’ বা সুন্দরতম নামসমূহ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকো।’(সুরা আল-আরাফ, আয়াত : ১৮০)
এ বিষয়ে আরো দেখুন—সুরা আল-ইসরা, ১৭:১১০ এবং সুরা আল-হাশর, ৫৯:২২।
হাদিসের বর্ণনা মতে, মহান আল্লাহর ৯৯টি গুণবাচক নাম আছে। এসব নাম অর্থসহ জানা ও সংরক্ষণ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর ৯৯টি নাম আছে। যে ব্যক্তি সেগুলো সংরক্ষণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৭৩৬)
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সেগুলো গণনা ও যথাযথভাবে আয়ত্ত (মুখস্থ) করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
আল্লাহর সুন্দর নাম নিয়ে আলেমদের মতপার্থক্য
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ইমাম তিরমিজির বর্ণিত তালিকাটি নির্বাচন করেছেন।
তালিকাটি নিম্নরূপ :
হুয়াল্লাহুল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়া
১. আর-রহমান—পরম করুণাময়।
২. আর-রহিম—অসীম দয়ালু।
৩. আল-মালিক—সর্বময় অধিপতি।
৪. আল-কুদ্দুস—মহাপবিত্র।
৫. আস-সালাম—ত্রুটিমুক্ত ও শান্তিদাতা।
৬. আল-মুমিন—নিরাপত্তাদানকারী।
৭. আল-মুহাইমিন—সর্বতত্ত্বাবধায়ক ও সংরক্ষণকারী।
৮. আল-আজিজ—মহাপরাক্রমশালী।
৯. আল-জাব্বার—মহাপ্রতাপশালী ও সংশোধনকারী।
১০. আল-মুতাকাব্বির—মহত্ত্ব ও বড়ত্বের অধিকারী।
১১. আল-খালিক—সৃষ্টিকর্তা।
১২. আল-বারি—অস্তিত্বদানকারী।
১৩. আল-মুসাওয়ির—আকৃতিদানকারী।
১৪. আল-গাফফার—বারবার ক্ষমাকারী।
১৫. আল-কাহহার—সর্বজয়ী ও পরাভূতকারী।
১৬. আল-ওয়াহহাব—মহাদাতা।
১৮. আল-ফাত্তাহ—উন্মুক্তকারী ও ফয়সালাকারী।
১৯. আল-আলিম—সর্বজ্ঞ।
২০. আল-কাবিদ—সংকোচনকারী।
২১. আল-বাসিত—সম্প্রসারণকারী।
২৩. আর-রাফি—উন্নীতকারী।
২৪. আল-মুইয—সম্মানদাতা।
২৫. আল-মুযিল—অপমানিতকারী।
২৬. আস-সামি—সর্বশ্রোতা।
২৭. আল-বাসির—সর্বদ্রষ্টা।
২৮. আল-হাকাম—চূড়ান্ত ফয়সালাকারী।
২৯. আল-আদল—ন্যায়বিচারক।
৩০. আল-লতিফ—অতি সূক্ষ্মদর্শী ও অনুগ্রহশীল।
৩১. আল-খবির—সর্ববিষয়ে অবহিত।
৩২. আল-হালিম—পরম সহনশীল।
৩৩. আল-আজিম—মহামহিম।
৩৪. আল-গাফুর—পরম ক্ষমাশীল।
৩৫. আশ-শাকুর—অল্প আমলের অধিক প্রতিদানদাতা।
৩৬. আল-আলিয়্যু—সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
৩৭. আল-কাবির—সর্বশ্রেষ্ঠ ও মহান।
৩৮. আল-হাফিজ—সংরক্ষণকারী।
৩৯. আল-মুকিত—জীবিকা ও শক্তি সরবরাহকারী।
৪০. আল-হাসিব—হিসাব গ্রহণকারী ও যথেষ্ট।
৪১. আল-জালিল—মহিমান্বিত।
৪২. আল-কারিম—মহাদানশীল।
৪৩. আর-রাকিব—সদা পর্যবেক্ষণকারী।
৪৪. আল-মুজিব—দোয়া কবুলকারী।
৪৫. আল-ওয়াসি—অসীম ব্যাপকতার অধিকারী।
৪৬. আল-হাকিম—প্রজ্ঞাময়।
৪৭. আল-ওয়াদুদ—পরম প্রেমময়।
৪৮. আল-মাজিদ—মহাগৌরবময়।
৪৯. আল-বা‘ইস—পুনরুত্থানকারী।
৫০. আশ-শাহিদ—সর্বসাক্ষী।
৫১. আল-হাক্ক—চিরসত্য।
৫২. আল-ওয়াকিল—কর্মবিধায়ক ও নির্ভরযোগ্য অভিভাবক।
৫৩. আল-কাওয়িয়্যু—মহাশক্তিশালী।
৫৪. আল-মাতিন—সুদৃঢ় শক্তির অধিকারী।
৫৫. আল-ওয়ালিয়্যু—অভিভাবক ও সাহায্যকারী।
৫৬. আল-হামিদ—সব প্রশংসার অধিকারী।
৫৭. আল-মুহসি—সবকিছুর হিসাব সংরক্ষণকারী।
৫৮. আল-মুবদি—প্রথমবার সৃষ্টিকারী।
৫৯. আল-মু‘ঈদ—পুনরায় সৃষ্টিকারী।
৬০. আল-মুহয়ি—জীবনদানকারী।
৬১. আল-মুমিত—মৃত্যুদানকারী।
৬২. আল-হাইয়্যু—চিরঞ্জীব।
৬৩. আল-কাইয়্যুম—স্বয়ং প্রতিষ্ঠিত এবং সবকিছুর ধারক ও রক্ষণাবেক্ষণকারী।
৬৪. আল-ওয়াজিদ—অভাবমুক্ত ও সর্বপ্রাপ্ত।
৬৫. আল-মাজিদ—মহামর্যাদাবান।
৬৬. আল-ওয়াহিদ—একক।
৬৭. আস-সামাদ—অমুখাপেক্ষী ও সবার আশ্রয়স্থল।
৬৮. আল-কাদির—সর্বক্ষমতাবান।
৬৯. আল-মুকতাদির—পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী।
৭০. আল-মুকাদ্দিম—অগ্রসরকারী।
৭১. আল-মুয়াখখির—পশ্চাত্বর্তীকারী।
৭২. আল-আউয়াল—সর্বপ্রথম।
৭৩. আল-আখির—সর্বশেষ।
৭৪. আয-জাহির—প্রকাশ্য ও সর্বোচ্চ।
৭৫. আল-বাতিন—অপ্রকাশ্য ও অন্তর্নিহিত।
৭৬. আল-ওয়ালি—সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী।
৭৭. আল-মুতা‘আলি—সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
৭৮. আল-বার্র—পরম কল্যাণকারী।
৭৯. আত-তাওয়াব—তাওবা কবুলকারী।
৮০. আল-মুনতাকিম—প্রতিশোধ গ্রহণকারী।
৮১. আল-আফুউ—পাপ মোচনকারী।
৮২. আর-রাউফ—পরম স্নেহশীল।
৮৩. মালিকুল মুলক—সমগ্র রাজত্বের মালিক।
৮৪. যুল-জালালি ওয়াল-ইকরাম—মহিমা ও সম্মানের অধিকারী।
৮৫. আল-মুকসিত—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী।
৮৬. আল-জামি—একত্রকারী।
৮৭. আল-গানিয়্যু—অমুখাপেক্ষী ও অভাবমুক্ত।
৮৮. আল-মুগনি—অভাবমোচনকারী।
৮৯. আল-মানি—প্রতিরোধকারী।
৯০. আদ-দার—ক্ষতি সংঘটনের ক্ষমতার অধিকারী।
৯১. আন-নাফি—উপকারদানকারী।
৯২. আন-নূর—আলো।
৯৩. আল-হাদি—পথপ্রদর্শক।
৯৪. আল-বাদি—অতুলনীয় সৃষ্টির উদ্ভাবক।
৯৫. আল-বাকি—চিরঅবশিষ্ট।
৯৬. আল-ওয়ারিস—চূড়ান্ত উত্তরাধিকারী।
৯৭. আর-রাশিদ—সঠিক পথপ্রদর্শক।
৯৮. আস-সবুর—অত্যন্ত ধৈর্যশীল।
তালিকার সূত্র: সুনানে তিরমিজি, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত; ফাতহুল বারি : ১১/২১৩।
নামের সংখ্যা নিয়ে আলেমদের মতপার্থক্য
আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের হাদিসে বিভিন্ন বর্ণনা থাকার কারণে আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে—আল্লাহর নাম কি কেবল ৯৯টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি তাঁর নামের সংখ্যা এর চেয়ে বেশি?
একদল আলেম আবু হুরায়রা (রা.)-এর পূর্বোক্ত হাদিসের শব্দের ওপর আক্ষরিকভাবে নির্ভর করে নামের সংখ্যা ৯৯টিতে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। অন্য একদল আলেম বলেছেন, আল্লাহর নামের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়; বরং তাঁর পবিত্র সত্তার উপযোগী সব নামই এর অন্তর্ভুক্ত। এই দ্বিতীয় দলের পক্ষে কয়েকটি যুক্তি আছে—
১. আল্লাহর নামের তালিকা নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা আছে। এসব বর্ণনার মধ্যে একক কোনো তালিকার ওপর ঐকমত্য নেই।
২. তিরমিজির তালিকায় এমন কিছু আছে, যেগুলো পবিত্র কোরআনে আসেনি। যেমন—আল-জালিল (মহিমান্বিত), আল-খাফিদ (অবনতকারী) ও আর-রাশিদ (সঠিক পথপ্রদর্শক)।
আবার কোরআনে এমন কিছু নাম ও গুণবাচক শব্দ এসেছে, যেগুলো তিরমিজির তালিকায় নেই। যেমন—আল-মাওলা (অভিভাবক), আল-খাল্লাক (মহাস্রষ্টা) ও আল-মুদাব্বির (পরিচালনাকারী)
৩. ৯৯টির চেয়েও বেশি নামের ব্যাপারে ওহিনির্ভর বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন—আস-সাইয়িদ (মহান নেতা ও অধিপতি)। একটি বর্ণনায় এসেছে, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেন, ‘হে আমার নেতা!’ তখন তিনি বললেন, সাইয়িদ বা প্রকৃত অধিপতি হলেন আল্লাহ তাআলা। একইভাবে ‘আদ-দাইয়ান’, ‘আল-হান্নান’ এবং ‘আল-মান্নান’ নামের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ মতের প্রবক্তাদের মধ্যে রয়েছেন ইবনে আব্বাস (রা.), ফখরুদ্দিন আর-রাজি, ইবন কাসির, ইমাম গাজ্জালি, ইমাম কুরতুবি ও ইমাম বায়হাকি (রহ.)।
আলেমদের মতপার্থক্যের সমন্বয় ও ব্যাখ্যা
যখন স্পষ্ট হলো যে আল্লাহ তাআলার নামসমূহ কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এবং সেগুলোকে ৯৯টিতে সীমাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা ছিল আলেমদের ইজতিহাদ বা গবেষণালব্ধ মত, তখন প্রশ্ন আসে—৯৯টি নামের কথা উল্লেখ করে যেসব হাদিস এসেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা কিভাবে করা হবে?
এ হাদিসগুলোর একাধিক ব্যাখ্যা আছে। এর মধ্যে যে ব্যাখ্যাটি গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে অধিক নিকটবর্তী, তা হলো হাদিসের বক্তব্য শুধু এ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয় যে আল্লাহর ৯৯টি নাম আছে; বরং বক্তব্যের পূর্ণতা এসেছে পরবর্তী অংশে, যে ব্যক্তি সেগুলো সংরক্ষণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। অথবা যে ব্যক্তি সেগুলো যথাযথভাবে আয়ত্ত করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। বিষয়টি এমন—যেমন কেউ বলল, ‘আরিফের কাছে এক হাজার দিনার আছে, যা তিনি সদকা করার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন।’
এ কথার অর্থ এই নয় যে তাঁর কাছে এক হাজার দিনার ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই; বরং এর অর্থ হলো তাঁর কাছে এক হাজার দিনার রয়েছে, যা তিনি সদকা করার জন্য নির্দিষ্ট করেছেন।
একইভাবে হাদিসের অর্থও এই নয় যে আল্লাহর নাম শুধু ৯৯টি; বরং এর অর্থ হলো আল্লাহর অনেক নাম রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ৯৯টি এমন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যে, যে ব্যক্তি সেগুলো যথাযথভাবে আয়ত্ত করবে কিংবা সংরক্ষণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (আর-রাজির শরহু আসমাইল্লাহিল হুসনা, বৈরুত, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা-৭৮)
আরেকটি মত হলো আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহে বর্ণিত সুন্দর নামগুলোর মধ্যেই এই ৯৯টি নাম বিদ্যমান; তবে সেগুলো নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা হয়নি। কোরআন ও সুন্নাহতে আল্লাহর নামের সংখ্যা দুই শতাধিক পর্যন্ত পৌঁছেছে। এ নামগুলোকে এমনভাবে গোপন রাখা হয়েছে, যেমন রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদরকে গোপন রাখা হয়েছে; জুমার দিনের মধ্যে দোয়া কবুলের বিশেষ সময়কে গোপন রাখা হয়েছে।
এর উদ্দেশ্য হলো মুসলিম যেন এসবের সন্ধানে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালায়, কল্যাণ অর্জনের চেষ্টা করে এবং প্রতিটি সম্ভাব্য সময় ও আমলে মনোযোগী হয়, যাতে সে এসবের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত ফজিলত লাভ করতে পারে।

