তারকার প্রতি ভক্তদের ভালোবাসা কখনো কখনো অদ্ভুত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। প্রিয় অভিনেত্রীর ব্যবহৃত পোশাক, জুতা কিংবা ব্যক্তিগত জিনিস সংগ্রহ করতে অনেকেই বিপুল অর্থ খরচ করেন। কিন্তু কোনো অভিনেত্রীর গোসলের পানি দিয়ে সাবান তৈরি করে তা বিক্রির ঘটনা নিশ্চয়ই ব্যতিক্রমী। অবিশ্বাস্য মনে হলেও, হলিউড অভিনেত্রী সিডনি সুইনিকে ঘিরে এমন ঘটনাই ঘটেছিল ২০২৫ সালে। মাত্র ৮ ডলারের সাবানটি পরে পুনর্বিক্রির বাজারে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২ লাখ টাকায়।
কিন্তু কেন তৈরি হয়েছিল এই সাবান? কীভাবে একজন অভিনেত্রীর গোসলের পানি হয়ে উঠল বিপণনের উপকরণ? আর ভক্তদের এমন আগ্রহের পেছনে কাজ করে কোন মনস্তত্ত্ব?
যেভাবে তৈরি হলো গোসলের পানির সাবান
সিডনি সুইনি একজন মার্কিন অভিনেত্রী। ১৯৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যে জন্ম তার। এইচবিওর জনপ্রিয় সিরিজ ‘ইউফোরিয়া’তে ক্যাসি হাওয়ার্ড চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। পরে ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’ ও ‘অ্যানিওয়ান বাট ইউ’-এর মতো কাজের মাধ্যমে হলিউডে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
ঘটনার শুরু ২০২৪ সালে। পুরুষদের পরিচর্যাপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ড. স্কোয়াচের একটি বিজ্ঞাপনে অংশ নেন সিডনি। বিজ্ঞাপনে তাকে বাথটাবে বসে প্রতিষ্ঠানটির বডি ওয়াশের প্রচার করতে দেখা যায়। সেখানে তাকে দেখানো হয়েছিল ‘বডি ওয়াশ জিনি’ হিসেবে।
বিজ্ঞাপনটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের অনেকে মজা করে সিডনির গোসলের পানি চেয়ে মন্তব্য করতে থাকেন। বিষয়টি প্রথমে নিছক ইন্টারনেটের রসিকতা হলেও পরে সেটিকেই বিপণনের সুযোগ হিসেবে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৫ সালের মে মাসে ঘোষণা দেওয়া হয়, সিডনির গোসলের পানির অংশবিশেষ ব্যবহার করে বিশেষ সাবান তৈরি করা হচ্ছে। সাবানটির নাম দেওয়া হয় ‘সিডনিস বাথওয়াটার ব্লিস’।
সিডনি নিজেও জানিয়েছেন, বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ের সময় বাথটাবে গোসল করেছিলেন তিনি। সেখান থেকে সংগ্রহ করা পানির সামান্য অংশ ব্যবহার করা হয়েছে সাবান তৈরিতে। ফলে এটি কেবল প্রচারণার জন্য দেওয়া কোনো নাম ছিল না।
কত দামে বিক্রি হয়েছিল সাবানটি?
সাবানটিতে গোসলের পানির পাশাপাশি ছিল এক্সফোলিয়েটিং উপাদান ও পাইন বার্ক এক্সট্র্যাক্ট। এর সুগন্ধে রাখা হয়েছিল পাইন, ডগলাস ফার ও মাটির সোঁদা ঘ্রাণ। সিডনির বেড়ে ওঠার অঞ্চল প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রকৃতির ঘ্রাণ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল এতে।
২০২৫ সালের ৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সাবানটি বিক্রির জন্য উন্মুক্ত করা হয়। প্রতিটির দাম রাখা হয়েছিল ৮ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক হাজার টাকা। তৈরি করা হয়েছিল মাত্র পাঁচ হাজার সাবান।
সীমিত সংস্করণের এই পণ্য দ্রুত আলোচনায় আসে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। পরে পুনর্বিক্রির বাজারে সাবানটির দাম উঠে প্রায় ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ মূল দামের তুলনায় কয়েক শ গুণ বেশি দামে বিক্রির ঘটনা ঘটে।
মজার বিষয় হলো, সাবান তৈরির ধারণাটি সিডনি নিজেই দিয়েছিলেন বলে পরে এক সাক্ষাৎকারে জানান।
ভক্তদের এমন আগ্রহের পেছনে কী মনস্তত্ত্ব?
একজন অভিনেত্রীর গোসলের পানি দিয়ে তৈরি সাবান কেনার আগ্রহ কি নিছক কৌতূহল, নাকি এর পেছনে রয়েছে বিশেষ কোনো মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা?
মনোবিজ্ঞানে ‘প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ’ নামে একটি ধারণা রয়েছে। এর অর্থ, কোনো তারকা বা পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে দর্শকের একতরফা মানসিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়া। একজন ভক্ত মনে করতে পারেন, তিনি প্রিয় তারকাকে খুব ভালোভাবে চেনেন কিংবা তার সঙ্গে একধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। অথচ বাস্তবে ওই তারকা ভক্তকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না।
এ ধরনের অনুভূতি থেকে তারকার ব্যবহৃত কোনো জিনিস সংগ্রহ করার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে। প্রিয় তারকার সঙ্গে প্রতীকী ঘনিষ্ঠতা অনুভব করতেই কেউ কেউ তার ব্যবহৃত জিনিস সংগ্রহ করেন।
এর পাশাপাশি তারকাদের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ, তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল কিংবা শরীরকে পণ্য হিসেবে দেখার প্রবণতাও এমন আগ্রহের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এই সাবান কেনা প্রত্যেকের উদ্দেশ্য যে যৌন আকর্ষণ বা বিকৃত লালসা, তা বলার সুযোগ নেই। কেউ কৌতূহল, কেউ হাস্যরস, আবার কেউ সীমিত সংস্করণের পণ্য সংগ্রহের শখ থেকেও এটি কিনে থাকতে পারেন।
তারকার জনপ্রিয়তা, ভক্তের ব্যক্তিগত সীমারেখা
ঘটনাটি শুধু একটি অদ্ভুত পণ্য বিক্রির গল্প নয়; তারকাদের জনপ্রিয়তাকে কীভাবে বিপণনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তারও একটি উদাহরণ।
সিডনি নিজেও এই উদ্যোগকে বিপণনের অভিনব কৌশল হিসেবে দেখেছেন। এর মাধ্যমে পুরুষদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও শরীরের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির সুযোগও ছিল।
তবে এ ঘটনা একটি প্রশ্ন সামনে আনে—একজন তারকার জনপ্রিয়তা কি তাকে ঘিরে যেকোনো ধরনের কৌতূহলকে বৈধতা দেয়? ভক্তের ভালো লাগা আর ব্যক্তিগত সীমানা লঙ্ঘনের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কোনো তারকাকে পছন্দ করার অর্থ তার ব্যক্তিগত জীবন বা শরীরের ওপর অধিকার তৈরি হওয়া নয়।
শেষ পর্যন্ত সিডনির গোসলের পানি দিয়ে তৈরি সাবান হয়তো বিপণনের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবেই থেকে যাবে। তবে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, তারকাদের ঘিরে মানুষের কৌতূহলকে কাজে লাগিয়ে বিপণন কতটা অপ্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। যেখানে একজন তারকার গোসলের পানিও হয়ে উঠতে পারে হাজার হাজার ডলারের ব্যবসার উপকরণ। সূত্র: গলফ নিউজ

