spot_img

সক্ষমতা কম থাকলেও ‘ইসলামি ন্যাটো’ গঠনে কৌশলী তুরস্ক

অবশ্যই পরুন

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে চলতি বছরের ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তি বাস্তব নিরাপত্তা চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন আঙ্কারার পক্ষে চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তিন বছর আগে প্রতিরোধ যোদ্ধা ফিলিস্তিনি হামাস গ্রুপ ইসরায়েল আক্রমণ এবং এরপর মার্কিন সমর্থনে ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার প্রেক্ষাপটে এই প্রয়োজনীয়তা আরো প্রকট হয়ে উঠেছিল। সম্প্রতি দ্রুতগতিতে ঘটতে থাকা নানা ঘটনাপ্রবাহ মক্কা চুক্তিকে প্রত্যাশার চেয়েও আগে পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে। যদিও জোটের সদস্য দেশগুলো তাদের সামনে থাকা ঝুঁকিগুলোকে হয়তো একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে, তবু বর্তমান ব্যবস্থার পরিবর্তে তারা ঠিক কী ধরনের অভিন্ন নিরাপত্তাকাঠামো ও আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে চায়, তা এখনো অস্পষ্ট।

এই জোটটিকে আরো সুসংহত করার জন্যও সময়ের প্রয়োজন।

এই জোটে ভৌগোলিক অবিচ্ছিন্নতার অভাব, প্রযুক্তিগত অসামঞ্জস্য এবং বিভিন্ন হুমকি ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে সমন্বয়ের ঘাটতির মতো এমন কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা দূর করা সহজ নয়; যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে। মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী তুরস্কের নিজস্ব নিরাপত্তার পরিধিও এখন অনেক বেড়েছে। একসময় আংকারার নিরাপত্তা-ভাবনা শুধু নিজেদের সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তাদের স্বার্থ হর্ন অব আফ্রিকা থেকে শুরু করে ককেশাস পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থতার কারণে তুরস্কের মতো একটি রাষ্ট্রকে বিশাল এলাকাজুড়ে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি প্রসারিত করতে হয়েছে।

তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আংকারা তিনটি সংকটের মুখোমুখি। তুরস্কের সামনে থাকা সংকটগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো সক্ষমতার সংকট। দেশটি বর্তমানে প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসের অন্যতম গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে দেশের নাগরিকরা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখা সম্ভব হলেও তা করতে গিয়ে জনজীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাড়তি চাপিয়ে দিতে হয়।

প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর মানেই হলো স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি এবং সাধারণ মানুষের এরই মধ্যে তলানিতে ঠেকে যাওয়া জীবনযাত্রার মানে কাটছাঁট করা।

আর এটি দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকার সক্ষমতার ক্ষেত্রে এক গুরুতর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকার এমন উচ্চাভিলাষী নিরাপত্তাকাঠামো টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সামাজিক বৈধতা অর্জনেও হিমশিম খাচ্ছে। অতীতে দেখা গেছে, বিদেশে সেনা পাঠানো বা প্রতিরক্ষা জোট গঠনের মতো বিষয়ে পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব আসনসংখ্যার চেয়েও বেশি সমর্থন পাওয়া গেছে।

তবে বর্তমান সময়ে সরকার রাজনীতিকে একটি শূন্য-যোগের খেলা হিসেবে দেখছে, যেখানে এক পক্ষের জয় মানেই অন্য পক্ষের পরাজয়। সরকার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করার জন্য কোনো প্রচেষ্টাই বাকি রাখছে না। আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সীমান্ত পেরিয়ে সেনা মোতায়েনের মতো বিষয়গুলোর জন্য পার্লামেন্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়; আর যে সরকার তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর, তাদের পক্ষে এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাপক সমর্থন আদায় করা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। এই ব্যবধানটি দূর করার জন্য যদি কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা অর্থাৎ ‘আমি করেছি, তাই এটি সম্পন্ন হয়েছে’ প্রয়োগ করা হয়, তবে গৃহীত পদক্ষেপটি সঠিক ও প্রয়োজনীয় হলেও তা গণতান্ত্রিক বা আইনসম্মত হয়ে ওঠে না।

উদ্বেগের তৃতীয় ক্ষেত্রটি হলো সেই অন্তঃসারশূন্য ফাঁকা বুলি, যা খোদ সরকারই উসকে দিয়েছে। চুক্তিটিতে মুসলমানদের পবিত্র শহর মক্কার নাম জড়িয়ে আছে, যা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে। তাই এটিকে খাটো করে দেখা ভুল হবে। অথচ তিন দেশের একটি জোট, যার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো এখনো স্পষ্ট নয়, তাকে শুরু থেকেই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বলে অভিহিত করাটা এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা অথবা জনগণের কাছে মিথ্যা বলার শামিল। একইভাবে মুদির দোকানের হিসাবের খাতার মতো করে বিভিন্ন দেশের সামরিক শক্তিকে যোগ করে অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ বয়ান তৈরি করাটাও একই রকম মিথ্যাচারের সমান।

এই তিন দেশের সম্মিলিত শক্তি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাংকবহর, দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক যানবাহনের ভাণ্ডার এবং তৃতীয় বৃহত্তম হেলিকপ্টারবহর গঠন করেছে বলে যে দাবি করা হয়, তা এ ধরনের বাগাড়ম্বরেরই উদাহরণ। এ ধরনের বাগাড়ম্বরের শ্রোতা হয়তো সব সময়ই থাকবে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই হবে অধিকতর যুক্তিসংগত। কারণ অবাস্তব প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত শুধু হতাশা ও মানসিক আঘাতই বয়ে আনে, যা কোনো সমাজের জন্যই কাম্য নয়।

[লেখক : তুরস্কের আংকারা ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০০৯-২০১৪) ও প্রধানমন্ত্রী (২০১৪-২০১৬) আহমেত দাভুতোগলুর তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

সর্বশেষ সংবাদ

বিনয় ও নম্রতা মানুষের সম্মান বৃদ্ধি করে

সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচুর অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক হয়েও নিজেকে জাহির করতে ব্যস্ত থাকেন। অন্যদের ছোট...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ