যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি বড় ধাক্কা দেয়। আদালত তার জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে।
মঙ্গলবার ওই রায়ে একই সঙ্গে আদালত রাজ্যগুলোকে নারীদের ক্রীড়া দলে তৃতীয় লিঙ্গের (ট্রান্সজেন্ডার) শিক্ষার্থী-অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে দেয় এবং কিছু প্রচারাভিযান অর্থায়ন সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতাও বাতিল করে।
নয় মাসব্যাপী সুপ্রিম কোর্টের বার্ষিক মেয়াদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রায় হয়েছে। ট্রাম্প রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও অভিবাসন বিষয়ে কিছু বড় জয় পেলেও শুল্কনীতি, ফেডারেল রিজার্ভের এক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রশ্নে পরাজিত হন।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব
অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অংশ হিসেবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করা ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল। ক্ষমতায় ফিরে আসার প্রথম দিনেই তিনি এ বিষয়ে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন।
১৮৬৮ সালে গৃহযুদ্ধের পর দাসপ্রথা বিলুপ্তির প্রেক্ষাপটে অনুমোদিত ১৪তম সংশোধনীতে বলা হয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছে এবং ‘তার এখতিয়ারের অধীন’, তারা নাগরিক। কেবল বিদেশি কূটনীতিকদের সন্তান বা শত্রু বাহিনীর দখলদার সদস্যদের সন্তানদের মতো সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে।
‘তখন যেমন, এখনো নাগরিকত্ব মানে অধিকার পাওয়ার অধিকার — আমাদের রাজনৈতিক সমাজে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের অধিকার।’
রবার্টস লিখেছেন, ১৪তম সংশোধনীর প্রণেতারা এই প্রতিশ্রুতি দেশের প্রতিটি স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্য সম্প্রসারিত করেছিলেন। আমরা আজও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।
ট্রাম্পের আদেশে বলা হয়েছিল, যদি কোনো শিশুর বাবা-মায়ের কেউই মার্কিন নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দা (গ্রিন কার্ডধারী) না হন, তবে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও তাকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। সমালোচকেরা ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিকে বর্ণ ও ধর্মভিত্তিক বৈষম্যমূলক বলে অভিযোগ করেছেন।
মামলার চ্যালেঞ্জকারীদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনকারী সিসিলিয়া ওয়াং বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত একটি মৌলিক আমেরিকান প্রতিশ্রুতিকে পুনরায় নিশ্চিত করেছে — আপনি যদি এখানে জন্মান, আপনি নাগরিক।’ কোনো প্রেসিডেন্ট নির্বাহী আদেশ দিয়ে সংবিধান বদলাতে পারেন না।
রায়ের পর ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের জন্য “খুবই খারাপ” এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বন্ধ করতে কংগ্রেসকে কাজ করার আহ্বান জানান।
ট্রান্সজেন্ডার ক্রীড়া
ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও আইডাহোর আইন অনুযায়ী, সরকারি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া দলগুলো ‘জৈবিক লিঙ্গ’ অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং ‘পুরুষ লিঙ্গের’ শিক্ষার্থীরা নারীদের দলে খেলতে পারবে না। রাজ্যগুলো বলেছে, এতে নারী ও কন্যাদের জন্য ন্যায্য ও নিরাপদ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়। আরও ২৫টি রাজ্যে একই ধরনের আইন রয়েছে।
সমালোচকেরা এসব ব্যবস্থাকে ট্রান্সজেন্ডার আমেরিকানদের অধিকার খর্ব করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখেছেন।
সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের সেই রায়গুলো বাতিল করে, যেগুলো ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থীদের পক্ষে গিয়েছিল। আদালত ৯-০ ভোটে সিদ্ধান্ত দেয় যে এই আইনগুলো টাইটেল IX নামের ফেডারেল বৈষম্যবিরোধী আইনের লঙ্ঘন নয়। তবে ১৪তম সংশোধনীর সমান সুরক্ষার অধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে বিচারপতিরা আদর্শিক ভিত্তিতে বিভক্ত হন; ছয় রক্ষণশীল বিচারপতি রাজ্যগুলোর পক্ষে অবস্থান নেন।
বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ রায়ে লিখেছেন, ‘টাইটেল ৯ ও সমান সুরক্ষা ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা বলছি, রাজ্যগুলো নারীদের ও কন্যাদের খেলাধুলা স্ত্রী লিঙ্গের (জৈবিক নারীদের) জন্য সংরক্ষিত রাখতে পারে।’
রায়ের পর ট্রাম্প লেখেন, ‘বড় জয়: সুপ্রিম কোর্ট নারীদের খেলায় পুরুষদের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে।’
গত এক বছরে তৃতীয় লিঙ্গের (ট্রান্সজেন্ডার) বাদীপক্ষের বিরুদ্ধে এটি আদালতের দ্বিতীয় বড় রায়। ২০২৫ সালের জুনে আদালত টেনেসি অঙ্গরাজ্যের তৃতীয় লিঙ্গের (ট্রান্সজেন্ডার) অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লিঙ্গ-সমর্থনমূলক চিকিৎসা নিষিদ্ধ করার আইন বহাল রেখেছিল।
নির্বাচনী অর্থায়ন
২০১০ সালের পর থেকে সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার প্রচারাভিযান অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। মঙ্গলবার আদালত ভাইস প্রেসিডেন্ট
জেডি ভ্যান্সসহ রিপাবলিকান চ্যালেঞ্জকারীদের পক্ষে রায় দেয়। এতে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে সমন্বিত ব্যয়ের ওপর ফেডারেল সীমা বাতিল হয়।
৬-৩ ভোটের এই রায়ে আদালত বলে, প্রার্থীদের সঙ্গে পরামর্শ করে দলগুলো কত টাকা ব্যয় করতে পারবে তার বর্তমান সীমা সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর বাক্স্বাধীনতার সুরক্ষার পরিপন্থী।
গুরুত্বপূর্ণ একটি মেয়াদ
এই মেয়াদে সুপ্রিম কোর্ট আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে: ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় জরুরি ক্ষমতার আইনে ট্রাম্পের আরোপিত বৈশ্বিক শুল্কনীতি প্রত্যাখ্যান।
সোমবার ফেডারেল ট্রেড কমিশনের এক সদস্যকে বরখাস্ত করার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সমর্থন, ফলে স্বাধীন সংস্থার কর্মকর্তাদের অপসারণে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ে।
তবে একই দিনে ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের সদস্য লিসা কুককে তাৎক্ষণিক বরখাস্তের অনুমতি না দেওয়া।
এপ্রিল মাসে ভোটাধিকার আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা দুর্বল করা।
হাইতি ও সিরিয়ার শত-সহস্র অভিবাসীর মানবিক সুরক্ষা বাতিলের অনুমতি দেওয়া।
আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে রায়।
কলোরাডোর ‘কনভার্সন থেরাপি’ নিষিদ্ধ আইন বাতিল।
বন্দুক বহনের অধিকার আরও সম্প্রসারণ এবং হাওয়াইয়ের অস্ত্র বহন-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ বাতিল।
আগামী মেয়াদ
আদালত আগামী অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া নতুন মেয়াদের জন্য কয়েকটি মামলাও গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে আরেকটি বড় অস্ত্র-সংক্রান্ত মামলা — বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের অ্যাসল্ট-স্টাইল রাইফেল নিষিদ্ধ আইনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: রয়টার্স

