দুই বছর আগের সেই জার্মানির বার্লিন ওলিম্পিয়াড স্টেডিয়াম। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ইউরোপ সেরার মুকুট মাথায় তোলার পর স্প্যানিশ ফুটবলে যে নতুন জোয়ার এসেছিল, তার রেশ এখনো কাটেনি। তবে ইউরো জয়ের আনন্দ এখন অতীত, লুইস দে লা ফুয়েন্তের ‘লা রোজা’দের চোখ এখন উত্তর আমেরিকার মহাযুদ্ধে। ২০১০ সালের সেই সোনালী ট্রফি জয়ের পর বিশ্বকাপে স্পেনের গল্পটা কেবলই হতাশার আর দ্রুত বিদায়ের। টিকি-টাকার গোলকধাঁধায় আটকে গিয়ে গত কয়েকটি বিশ্বকাপে তারা হারিয়ে ফেলেছিল নিজেদের চেনা ছন্দ। তবে দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্প্যানিশ ফুটবল এখন অনেক বেশি গতিশীল, আধুনিক এবং সরাসরি আক্রমণাত্মক।
আগামী ১৫ জুন আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে স্পেনের ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান। গ্রুপ ‘এইচ’-এর এই লড়াইয়ে নামার আগে কেমন হতে যাচ্ছে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের স্কোয়াড এবং রণপরিকল্পনা তা এখন সময়ের অপেক্ষা।
কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তার চেনা ছক ৪-৩-৩ ফর্মেশনকেই বিশ্বকাপের মূল হাতিয়ার করছেন। বল পজিশন ধরে রাখার পাশাপাশি দুই প্রান্ত দিয়ে গতি বাড়ানোই এই কৌশলের মূল ভিত্তি। গোলপোস্টের নিচে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের উনাই সিমনই থাকছেন এক নম্বর পছন্দ হিসেবে। তবে ব্যাকআপ হিসেবে আর্সেনালের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো ডেভিড রায়া এবং বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জেতা জোয়ান গার্সিয়ার উপস্থিতি স্পেনের গোলকিপিং পজিশনকে করে তুলেছে দারুণ শক্তিশালী।
ডিফেন্সে এবার বড় চমক দেখিয়েছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। রিয়াল মাদ্রিদের কোনো খেলোয়াড় ছাড়াই এবার বিশ্বকাপ স্কোয়াড সাজিয়েছে স্পেন, যা দলটির ইতিহাসে প্রথম। ডিন হাইসেন কিংবা রাউল আসেনসিওর মতো মাদ্রিদ তারকারা জায়গা পাননি দলে। রক্ষণভাগে বার্সেলোনার তরুণ তুর্কি পাউ কুবার্সির সাথে জুটি বাঁধবেন অভিজ্ঞ আইমেরিক লাপোর্তে। অভিজ্ঞ দানি কারভাহাল না থাকায় রাইট-ব্যাকের পজিশনে পেড্রো পোরো এবং মার্কোস ইয়োরেন্তের মধ্যে দেখা যাবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আর লেফট-ব্যাকে ইউরো ফাইনালের নায়ক মার্ক কুকুরেয়ার ওপরই ভরসা রাখছেন লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
স্পেনের আসল শক্তির জায়গা তাদের মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ। বার্সেলোনার ফ্লিকের অধীনে চোট কাটিয়ে পুরোপুরি ফর্মে ফেরা পেদ্রি এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। তার সাথে মাঝমাঠের মূল নোঙর বা অ্যাঙ্কর হিসেবে থাকছেন ম্যানচেস্টার সিটির রদ্রি। চোটের কারণে গত দুটি বছর কিছুটা ভুগেছেন রদ্রি, তবে বিশ্বকাপে তার অভিজ্ঞতা দলের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। তৃতীয় সেন্টার মিডফিল্ডার হিসেবে গাভি এবং পিএসজিকে জেতানো ফ্যাবিয়ান রুইসের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে কোচকে। এছাড়া আর্সেনালের মিকেল মেরিনোও আছেন, যিনি প্রয়োজনে স্ট্রাইকার পজিশনেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
তবে স্পেনের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছে, তারা হলেন দুই উইঙ্গার লামিন ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামস। গত ইউরোতে এই তরুণ জুটি কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো বিশ্ব। তবে স্প্যানিশ শিবিরের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণও তারা দুজনে। দুজনেই মৌসুমের শেষদিকে চোটে ভুগেছেন। নিকো উইলিয়ামস কেপ ভার্দের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের আগে ফিট হবেন কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে।
অন্যদিকে, তরুণ সেনসেশন ইয়ামালকে হয়তো গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচের আগে মাঠেই নামানো সম্ভব হবে না। তাদের অনুপস্থিতিতে ডানি অলমো, ফেরান তোরেস কিংবা ইয়েরেমি পিনোদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব চাপবে। আর সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড বা ‘নাম্বার নাইন’ পজিশনে যথারীতি দেখা যাবে রিয়াল সোসিয়েদাদের মিকেল ওয়ারজাবালকে, যিনি বড় ম্যাচে গোল করার ক্ষমতার প্রমাণ আগেই দিয়েছেন।
বিশ্বকাপে স্পেনের মূল দুর্বলতা হতে পারে তাদের অতিরিক্ত উইং-নির্ভরতা। ইয়ামাল ও নিকো পুরোপুরি ফিট না থাকলে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে বল জোগানোর ধার কমে যেতে পারে। এছাড়া কারভাহালের মতো অভিজ্ঞ নেতার অনুপস্থিতিতে রাইট-ব্যাক পজিশন কাউন্টার অ্যাটাকের সময় কতটা জমাট থাকে, সেটিও দেখার বিষয়।

