spot_img

ইসলামে শ্রম ও সহকর্মীর মূল্য

অবশ্যই পরুন

মানুষের কর্মনৈপুণ্যের প্রত্যাশিত অনুষঙ্গ; যোগ্য সহকর্মী, সহযোগী। মহান আল্লাহ ও মুসা (আ.)-এর কথোপকথন (মুসা বললেন) আমার আপনজনদের মধ্য থেকে আমার সহযোগিতাকারী বানাও, হারুন আমার ভাই, তার দ্বারা তুমি আমার শক্তি বৃদ্ধি করো, তাকে আমার কাজের অংশীদার বানাও…।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ২৯- ৩৪)

আবারও আছে ‘ভালো সে কর্মচারী হবে নিশ্চয় যে শক্তিশালী ও বিশ্বাসী রয়।’ (কাব্যানুবাদ, সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৬)

কর্মবিমুখতা, পরমুখাপেক্ষিতা বা ভোগবাদিতা নয়, বরং শ্রমই ছিল নবী-রাসুলদের আদর্শ। সৃষ্টির সেরা জীব কখনো অপদার্থ হতে পারে না—‘অবশ্যই আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং তাদের জলে ও স্থলে প্রতিষ্ঠিত করেছি, তাদের উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭০)

এখানেই সহকর্মীর প্রয়োজন এবং সক্ষমতার মানদণ্ড ফুটে ওঠে। অথচ মানবস্বভাবের বৈচিত্র্য বিবেচনায় মিসরীয় সাহিত্যিক মোস্তফা লুিফ আল-মানফলুতির ভাষায় মানুষ চার স্তরে বিভক্ত : যারা অন্যের উপকার করে এবং নিজেরও উপকার করে। এরা দুর্লভ, এদের গ্রিক দার্শনিক ডাইওজিনাস দিনেরবেলাও প্রদীপ হাতে খুঁজে বেড়ান।

যারা অন্যের উপকারের দ্বারা নিজেও উপকৃত হওয়ার ফন্দি করে। এরা স্বৈরাচারী। এদের ভাবনা যেন এমন, দুনিয়ার মানুষগুলো জবাই করে দিলে এদের রক্ত জমাট বেঁধে সোনা হয়ে যেত।

যারা নিজের উপকার করে, কিন্তু অন্যের উপকার করে না, তারা হলো লোভাতুর কুকুরতুল্য।

যারা নিজের উপকার করে না এবং অন্যের উপকারও করে না, তারা হলো নির্বোধ কৃপণ; যেন সিন্দুক। সম্পদ সিন্দুকে থাকে, অথচ সিন্দুক তার কোনো স্বাদ পায় না।

কাজেই ইসলামে শ্রম ও সহকর্মীর মূল্যায়ন জরুরি। দৈহিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম-ঘাম মানুষের চলার গতিকে করে স্বচ্ছন্দ। কর্মীর স্বার্থ সংরক্ষণ একটি আমানত।

প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘তারা তোমাদের ভাই (মালিক-শ্রমিক), আল্লাহ তাদের দায়িত্ব তোমাদের ওপর অর্পণ করেছেন… সাধ্যাতীত কাজে তাদের বাধ্য করবে না।’ (বুখারি)। প্রিয় নবী (সা.)-এর বিখ্যাত উক্তি—‘শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।’ (বায়হাকি)

আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কর্মক্ষেত্র না হওয়ার প্রেক্ষাপটেই শ্রমিকের কষ্ট বলতে নজরে আসে ভবনধস, অগ্নিকাণ্ড, বেতনের দাবিতে রাজপথে অবস্থান। খুবই কষ্টে আছে চাতাল কন্যা, মুটে-মজুর, মাঝি, কামার, কুলি, কলুর মতো নানা নামের অখ্যাত শ্রমজীবী। সাঁওতাল, কৈরি, কোল যারা চা-শ্রমিক তাদের দৈনিক মজুরি অতি সামান্যই! কেউবা ‘আগাম শ্রম বিক্রি’ করে। বর্গাচাষির শ্রম-ঘামের ফসল ও তার মূল্য চলে যায় এক শ্রেণির মানুষের বিলাসী পেটে-পকেটে! আফসোস!

‘কপাল দোষে খাইছি মাটি

বাপে পুতে কামলা খাটি’!

দেশের এক কোটি নারী তাদের শ্রমের মূল্য ও স্বীকৃতি পায় না! সমাজ যে শিশুর দায়িত্ব নেয়নি সে-ই বাঁচার তাগিদে শ্রম বেছে নিলে তার বিরুদ্ধেই ওঠে ‘শিশু শ্রমে’র অভিযোগ।

সাংবাদিক, শিক্ষক, লেখক, অধ্যাপকদের বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান-প্রতিভা (intellectual labor)-এর  মূল্যও নেই ভোগবাদী ব্যবস্থায়। কেউবা ‘রিজকে’র সন্ধানে ভিটামাটি ছেড়ে পাড়ি জমান ভিনদেশে, পাচার হয় নারী-শিশু। নিরুপায় কেউ ধরে ভিক্ষাবৃত্তি, কেউবা গণিকাবৃত্তি!

কিছু অথর্ব, চামচা-চাটুকার, ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী সমাজে সব সময়ই থাকে। অথচ কর্মক্ষেত্রে সাফল্য নির্ভর করে সহকর্মীদের পারস্পরিক সুসম্পর্কের ওপর। শান্তিপূর্ণ কর্মপরিবেশের উপাদান হচ্ছে—ভালো আচরণ, অংশিদারি, সহানুভূতি, ধৈর্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ায় একে অপরের সাহায্য করো, কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনে একে অপরের সাহায্য করো না।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ০২)

সহকর্মীদের খোঁজখাতির করা, হাসিমুখে তাদের সঙ্গে কথা বলা ইবাদততুল্য। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘মুসলমান সে-ই, যার হাত ও মুখের অপকার হতে অপর মুসলমান নিরাপদ।’ (বুখারি)

অথচ আমাদের মনোভাব ‘হাত থাকতে মুখ কী…’! অন্যদিকে হাদিসের ভাষ্য—‘ভাইয়ের মুখের দিকে হাসিমুখে তাকানোও সদকা।’ (তিরমিজি)

বস্তুত বাস্তব জীবনে সৌহার্দ্য সাফল্য ও বিজয় নিশ্চিত করে। মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, ‘আমি তোমার ভাইয়ের মাধ্যমে তোমার বাহু শক্তিশালী করব এবং তোমাদের দুজনকে ক্ষমতা দান করব। ফলে তারা তোমাদের কাছেও পৌঁছাতে পারবে না। তোমরা ও তোমাদের অনুগতরা বিজয়ী হবেই।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৩৫)

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ কাপাসিয়া, গাজীপুর।

সর্বশেষ সংবাদ

সিলেটে শাহজালালের মাজার জিয়ারত করলেন প্রধানমন্ত্রী

একদিনের সফরে সিলেট পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (২ মে) সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমানটি সিলেট ওসমানী...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ