কর্মসংস্থান তৈরি করে মানুষকে হালাল রিজিক অন্বেষণে সহযোগিতা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। বিশুদ্ধ নিয়তে করলে ইসলামের দৃষ্টিতে এই কাজের মাধ্যমেও সওয়াবের আশা করা যেতে পারে। কেননা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে হালাল উপার্জনের পথ বের করাও নেক কাজে সহযোগিতা করার শামিল। আর মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে নেক কাজে সহযোগিতা করার প্রতি উত্সাহ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সত্কর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ২)
মানুষকে হালাল রিজিক অন্বেষণে সহযোগিতা করা এতটাই ফজিলতপূর্ণ কাজ যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই কাজে লিপ্ত ব্যক্তিকে মুজাহিদ বা সারা রাত দাঁড়িয়ে ইবাদত করে আবার দিনের বেলায় রোজা রাখা ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। হাদিস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, বিধবা ও মিসকিনের জন্য খাদ্য জোগাড় করতে চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের মতো অথবা রাতে নামাজে দণ্ডায়মান এবং দিনে সিয়ামকারীর মতো। (বুখারি, হাদিস : ৫৩৫৩)
কারো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া মানে তার গোটা পরিবারসহ তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু লোকের হালাল রিজিকের ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণ করা । দুনিয়াতে মানুষের উপকার করার যে কয়টি মাধ্যম আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো, তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি মানুষের উপকারে নিয়োজিত থাকে সে আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম। (মুজামুল আউসাত : ৬/১৩৯)
তাই সুযোগ থাকলে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। মানুষের উপকার করার অন্যতম মাধ্যম হলো, কর্মসংস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করা।
তা ছাড়া অসহায়ের খাবারের ব্যবস্থা করা, সামর্থ্য থাকলে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা রাসুল (সা.)-এর সুন্নত। তিনি কাউকে ভিক্ষা দেওয়ার চেয়ে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়াকে বেশি পছন্দ করতেন। আনাস ইবনে মালেক (রহ.) থেকে বর্ণিত, একদা নবী (সা.)-এর কাছে এক আনসারি ব্যক্তি এসে ভিক্ষা চাইলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমার ঘরে কিছু আছে কি? সে বলল, একটি কম্বল আছে, যার কিছু অংশ আমরা পরিধান করি এবং কিছু অংশ বিছাই। একটি পাত্রও আছে, তাতে আমরা পানি পান করি। তিনি বলেন, সেগুলো আমার কাছে নিয়ে এসো, লোকটি তা নিয়ে এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা হাতে নিয়ে বলেন, এ দুটি বস্তু কে কিনবে? এক ব্যক্তি বলল, আমি এগুলো এক দিরহামে নেব। তিনি দুইবার অথবা তিনবার বলেন, কেউ এর অধিক মূল্য দেবে কি? আরেকজন বলল, আমি দুই দিরহামে নিতে পারি। তিনি ওই ব্যক্তিকে তা প্রদান করে দুই দিরহাম নিলেন এবং ওই আনসারিকে তা প্রদান করে বলেন, এক দিরহামে খাবার কিনে পরিবার-পরিজনকে দাও এবং আরেক দিরহাম দিয়ে একটি কুঠার কিনে আমার কাছে নিয়ে এসো। লোকটি তাই করল। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বহস্তে তাতে একটি হাতল লাগিলে দিয়ে বলেন, যাও, তুমি কাঠ কেটে এনে বিক্রি করো। পনেরো দিন যেন আমি আর তোমাকে না দেখি। লোকটি চলে গিয়ে কাঠ কেটে বিক্রি করতে লাগল। অতঃপর সে এলো, তখন তার কাছে দশ দিরহাম ছিল। সে এর থেকে কিছু দিয়ে কাপড় এবং কিছু দিয়ে খাবার কিনল। রাসুল (সা.) বলেন, ভিক্ষা করে বেড়ানোর চেয়ে এ কাজ তোমার জন্য অধিক উত্তম। কেননা ভিক্ষার কারণে কিয়ামতের দিন তোমার মুখমণ্ডলে একটি বিশ্রি কালো দাগ থাকত। ভিক্ষা করা তিন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারোর জন্য বৈধ নয়। (১) ধুলা-মলিন নিঃস্ব ভিক্ষুকের জন্য; (২) ঋণে জর্জরিত ব্যক্তি; (৩) যার ওপর রক্তপণ আছে, অথচ সে তা পরিশোধ করতে অক্ষম। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৪১)
উপরোক্ত হাদিসে দেখা যায়, রাসুল (সা.) একজন ভিক্ষুকের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তার দরিদ্রতার গ্লানি দূর করেন। তিনি চাইলে তাকে এক-দুদিনের খাবার দিয়েও উপকার করতে পারতেন। কিন্তু তার দরিদ্রতা দূরীকরণে স্থায়ী সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মহানবী (সা.) অসহায় ব্যক্তিটিকে পুঁজি, ট্রেনিং, গাইডলাইন দিয়ে তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
অতএব বোঝা গেল যে মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও মুমিনের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ আমল। মহানবী (সা.)-এর সুন্নত পালনের নিয়তে করলে এক ধরনের ইবাদতও বটে। তাই কারো কর্মসংস্থান সৃষ্টির সামর্থ্য থাকলে তাকে সহযোগিতা করার আপ্রাণ চেষ্টা করা উচিত।

