spot_img

মা ও মানবাধিকার কর্মী নাদিয়া মুসার গল্প

অবশ্যই পরুন

২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর, রাত ৯টা ৩০ মিনিট। কেনিয়া থেকে আসা একটি বিমান ও. আর. টাম্বো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এতে ছিলেন ১৫৩ জন শিশু, নবজাতক, প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়স্ক ফিলিস্তিনি। এরা সাম্প্রতিক গাজা গণহত্যা থেকে বেঁচে এসে দক্ষিণ আফ্রিকায় আশ্রয়ের আশায় পাড়ি জমিয়েছে। যাত্রীদের জন্য পুরো ফ্লাইটজুড়ে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। তারা কি নামার অনুমতি পাবেন, নাকি অল্পের জন্য যেখান থেকে প্রাণ বাঁচিয়ে এসেছেন সেই গণহত্যার ভেতরেই আবার ফেরত পাঠানো হবে?

গাজা থেকে জোহানেসবার্গে পৌঁছানোর যাত্রা ছিল দীর্ঘ। গাজা থেকে তারা দক্ষিণের কারিম আবু সালেম সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলের রামোন বিমানবন্দরে যায়, সেখান থেকে কেনিয়া, তারপর দক্ষিণ আফ্রিকাগামী বিমানে ওঠে। বিমানটি অবতরণের পর দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সেটি আটকে রাখে।

লেনাসিয়ার মানবাধিকার কর্মী নাদিয়া মুসা আদম খবর পেয়ে ছুটে যান বিমানবন্দরে। তিনি জানতে পেরেছিলেন ফিলিস্তিনিদের ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি আছে। তিনি বলেন, ‘আমি ট্রাফিক, পারিবারিক দায়িত্ব বা সংগঠনের কাজ—কিছুই ভাবিনি। শুধু একটাই ভাবছিলাম: যদি তাদের ফেরত পাঠানো হয়? তারা কোথায় যাবে—ধ্বংসস্তূপে, আগুনের মধ্যে, নাকি শূন্যতার দিকে?”

অবশেষে দরজা খুলল এবং একে একে যাত্রীরা বেরিয়ে এলেন, সুটকেসের বদলে হাতে ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগ, নারীরা একাধিক স্তরের পোশাক পরে (কেননা তারা অতিরিক্ত পোশাক বহনের অনুমতি পায়নি), আর শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের সাথে আঁকড়ে ধরে। আগতদের মধ্যে ছিল ১৬ মাস বয়সী কামাল, যে তার বাবা-মা আমির ও জানিনের সঙ্গে এসেছে। কামালের গায়ে আগের দিনের ডায়াপারই ছিল, কারণ তাদের অতিরিক্ত কিছু নিতে দেওয়া হয়নি।’

ফিলিস্তিনের দেইর আল-বালাহের তরুণী মা জানিন এই ফ্লাইটটিকে কেবল একটি যাত্রা হিসেবে দেখেন না। তিনি বলেন, ‘আমি কামালকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলাম, নিজেকে দৃঢ় রাখার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কাঁপছিলাম। প্রতিটি মিনিট যেন শেষই হচ্ছিল না। ওপারে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তার কোনো ধারণাই ছিল না।’

আমির বলেন, সন্তানের কথা ভেবে তিনি নিজের ভয় নিজের মধ্যেই চেপে রেখেছিলেন। একজন বাবার ওপর দ্বিগুণ দায়িত্ব থাকে: সন্তানকে রক্ষা করা এবং ভেতরে যতই ভয় থাকুক, শান্ত থাকা। কিন্তু আগমনী লাউঞ্জে নাদিয়াকে দেখার পর জানিন ও আমির জানান, তারা এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করেন। জানিন বলেন, যেন নিজের পরিবারের কেউ তাদের স্বাগত জানাতে এসেছে। নাদিয়ার কাছে এই প্রথম মুহূর্তগুলোই ছিল একটি দীর্ঘ সম্পর্কের শুরু। তিনি বলেন, ‘সংহতি কোনো বিমানবন্দরের মুহূর্ত নয়, এটি আজীবনের অঙ্গীকার।’

পর্দার আড়ালে নাদিয়ার জীবন জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ। চার সন্তানের জননী নাদিয়া তার সন্তানদের ‘একটি দিকনির্দেশক কম্পাস’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা তাকে সবসময় ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনে। তার মতে, মাতৃত্ব তার কাজের বাধা নয়; বরং এটি তাকে আরও অনুপ্রাণিত করে। কেননা নিজের সন্তানদের বড় হতে দেখলে অন্য শিশুদের কষ্টকে উপেক্ষা করা অসম্ভব হয়ে যায়। তার সন্তানরাও তার মানবিক কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। কম্বল সংগ্রহ, খাদ্য প্যাকেট প্রস্তুত এবং নতুন আগত পরিবারগুলোকে স্বাগত জানাতে সাহায্য করে। নাদিয়া বলেন, আমি চাই তারা সংহতিকে শুধু কথায় নয়, প্রতিদিনের অভ্যাস হিসেবে দেখুক।

চার সন্তান লালনপালনের পাশাপাশি একটি মানবিক সংস্থা পরিচালনা করা সহজ নয়। অনেক রাতেই সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়ার পর তিনি নীরবে কেঁদে ফেলেন। তবুও প্রতিটি সকালে তিনি নতুন উদ্যমে জেগে ওঠেন এই বিশ্বাস নিয়ে যে তার কাজ সত্যিই পরিবর্তন আনছে। নাদিয়া বলেন, কখনো কখনো আমার সন্তানরা গাজার শিশুদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আমি সহজ ভাষায় যুদ্ধের কথা বোঝাই, নিরাপত্তা ও মর্যাদার দিকটি গুরুত্ব দিয়ে। আমি চাই তারা সহানুভূতি শিখুক, করুণা নয়। সুবিধা পাওয়া মানে দায়িত্বও নেওয়া।

নাদিয়ার মানবাধিকার সংগঠনের নাম ফ্যাব ফাউন্ডেশন, যা তিনি তাঁর প্রয়াত স্বামী ও তার ভাতিজির সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সংগঠনটি লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে।

নাদিয়ার কাছে মাতৃত্ব, সক্রিয় মানবিক কাজ এবং সংহতির বন্ধন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, প্রতিটিই অন্যটিকে শক্তি জোগায়। তার কাজ শুরু হয় নিজের ঘর থেকে, ছড়িয়ে পড়ে সমাজে এবং পৌঁছে যায় মহাদেশ পেরিয়ে।

দ্য নিউ আরব অবলম্বনে

সর্বশেষ সংবাদ

লারিজানি ছিলেন পারস্য জাতির জন্য সম্পদ: আরাঘচি

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচি ড. আলি লারিজানির শাহাদাতের চল্লিশতম দিন উপলক্ষে এক বার্তায় বলেছেন, ড. আলি...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ