ক্রীড়াঙ্গনে রাজনীতির প্রভাব দীর্ঘদিনের পুরনো বিতর্ক, যার সবশেষ শিকার হলেন বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমান। আইপিএলের আসন্ন আসরের জন্য ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) তাকে দলে নিলেও, মাঠের লড়াই শুরুর আগেই তাকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)।
চমকপ্রদ এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক চাপ বা অদৃশ্য কোনো প্রভাব কাজ করছে বলে মনে করছেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা। ভারতের ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি অলরাউন্ডার মদন লালও একে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। তার মতে, ‘ওপর মহলের’ বিশেষ নির্দেশের কারণেই কেকেআর মোস্তাফিজকে দল থেকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
গত মাসে আইপিএলের নিলামে বাংলাদেশি এই কাটার মাস্টারকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল। ২ কোটি রুপি ভিত্তি মূল্যের এই বাঁহাতি পেসারকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে ভেড়ায় কেকেআর। চেন্নাই সুপার কিংস আর দিল্লি ক্যাপিটালসের সঙ্গে লড়াই করে তাঁকে একরকম ছিনিয়ে নিয়েছিল বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানের দল।
কিন্তু মোস্তাফিজ আদৌ এবারের আইপিএলে খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গত কিছুদিনে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে নানা বিতর্কসূচক খবর উঠে আসছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা হচ্ছে দাবি করে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কিছু অংশ, ধর্মীয় কিছু সংগঠন ও ধর্মীয় গুরুদের কয়েকজন মোস্তাফিজকে কলকাতা দলে নেওয়ার কারণে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছিলেন।
পাশাপাশি মোস্তাফিজকে কলকাতা দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন নেতাদের কেউ কেউ ও কিছু সংগঠন। বাদ না দিলে মোস্তাফিজকে খেলতে দেওয়া হবে না, পিচ নষ্ট করে দেওয়া হবে- এ রকম হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
এই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত মোস্তাফিজকে কেকেআর দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। পরে কলকাতা নাইট রাইডার্সও আজ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ইস্যুতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন মদন লাল। তিনি বলেন, খেলাধুলার ভেতরে রাজনীতির এই অনধিকার প্রবেশ মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। তাঁর মতে, পরিস্থিতির চাপে অনেকটা একতরফাভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিসিআই।
মদন লাল সোজাসাপ্টা বলেছেন, ‘বিসিসিআই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ, তাদের চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কারও নেই। এমনকি শাহরুখ খানেরও না; কিন্তু খেলাধুলায় কেন এত রাজনীতি ঢুকছে? আমি জানি না ক্রিকেট কোন দিকে যাচ্ছে।’
তিনি মনে করেন, এখানে মোস্তাফিজ পরিস্থিতির শিকার। তিনি বলেন, মোস্তাফিজকে বাদ দিতে নিশ্চয়ই ওপর মহল থেকে চাপ ছিল। বাংলাদেশে যা ঘটছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক, কিন্তু খেলোয়াড়দের কেন এর মাঝখানে টেনে আনা হচ্ছে? এখানে শাহরুখ খানের দোষ কোথায়? নিলামে তো একটা কমিটি বসে খেলোয়াড় নির্বাচন করে।
তবে ভারতের মতো ক্রিকেটপাগল দেশে জাতীয় আবেগ যে অনেক বড় বিষয়, তা-ও মানছেন এই সাবেক তারকা।
তাঁর মতে, দেশ সবার আগে-এই ভাবনা থেকেই হয়তো বোর্ড এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তাঁর কথা, ‘দেশের মানুষের আবেগ সব সময়ই বড়। কোটি কোটি মানুষ ক্রিকেট ভালোবাসে বলেই আজ এসব ঘটছে। দিন শেষে দেশই সবার আগে, আর সেই জায়গা থেকে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়তো ভুল নয়।’

