মাদকবিরোধী সচেতনতায় নানা কর্মশালা, প্রচার-প্রচারণা চলছে। কিন্তু সন্তান কখন মাদক বা অন্য কোনো নেশার জালে জড়িয়ে পড়ছে, সেটি সবার আগে বুঝতে হবে বাবা-মাকেই। কারণ বয়ঃসন্ধিকালে শরীরের পরিবর্তনের পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের মনোজগতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। আচরণেও দেখা দেয় নানা ওঠানামা। ফলে নেশায় জড়িয়ে পড়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় স্বাভাবিক বয়সসন্ধিকালীন পরিবর্তন ভেবে এড়িয়ে যান অভিভাবকেরা।
পড়াশোনায় ব্যর্থতা, মা-বাবার বকুনি, স্কুল বা বন্ধুদের সঙ্গে অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা, পারিবারিক অস্থিরতা, সম্পর্কের বিচ্ছেদ, বিষণ্ণতা কিংবা হীনম্মন্যতার মতো নানা কারণে কিশোর-কিশোরীরা মাদকের মতো বিপজ্জনক ফাঁদে পা দিতে পারে। প্রথম দিকে বিষয়টি অনেক সময় পরিবারের অজানাই থেকে যায়। তবে সন্তানের আচরণ ও শারীরিক পরিবর্তনগুলো নিয়মিত খেয়াল করলে শুরুতেই সতর্ক হওয়া সম্ভব।
সন্তান হঠাৎ তার প্রিয় কাজ বা শখ থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে কি না, তা লক্ষ্য করুন। আগে যেসব কাজে আনন্দ পেত, সেগুলোতে আর আগ্রহ না থাকা, বন্ধুদের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের এড়িয়ে একা থাকতে চাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
মেজাজের অস্বাভাবিক ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষণ। অল্পতেই রেগে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ, কথায় কথায় চিৎকার করা কিংবা তুচ্ছ কারণে বিষণ্ণ হয়ে পড়ার মতো আচরণ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
পড়াশোনায় হঠাৎ অবনতি, মনঃসংযোগের ঘাটতি, স্কুল-কলেজে অনুপস্থিতি এবং দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াও সতর্ক হওয়ার কারণ হতে পারে।
সন্তান ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহারে অস্বাভাবিক গোপনীয়তা অবলম্বন করছে কি না, নিজের কাজ সম্পর্কে মিথ্যা বলার প্রবণতা বেড়েছে কি না কিংবা হঠাৎ অতিরিক্ত হাতখরচ চাইছে কি না—এসব বিষয়ও খেয়াল রাখা জরুরি।
কখনও ঘন ঘন কান্না, অতিরিক্ত রাগ কিংবা অবাধ্য আচরণ দেখা দিতে পারে। এমনকি জিনিসপত্র ছুড়ে মারা, ভাঙচুর করা বা পরিবারের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণ করার প্রবণতাও দেখা যেতে পারে।
শুধু আচরণ নয়, সন্তানের শারীরিক পরিবর্তনের দিকেও নজর দিতে হবে। যেমন—সারারাত জেগে থাকা, অস্বাভাবিক বেশি ঘুমানো, খাবারের প্রতি অনীহা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, চোখ লাল বা ফুলে থাকা কিংবা অল্প সময়ের মধ্যে হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
সন্তানের কথাবার্তাও লক্ষ্য করা জরুরি। সে অসংলগ্নভাবে কথা বলছে কি না, নিজের বক্তব্য গুছিয়ে বলতে পারছে কি না কিংবা ভাব প্রকাশে হঠাৎ সমস্যা হচ্ছে কি না, তা খেয়াল করুন।
নেশায় আসক্ত হলে অনেকের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতিও আগ্রহ কমে যেতে পারে। তাই সন্তানের দৈনন্দিন জীবনযাপনেও অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখা দরকার।
তবে এসব লক্ষণের একটিমাত্র উপস্থিতিই যে মাদকাসক্তির প্রমাণ—এমনটা নয়। বয়ঃসন্ধিকালে মানসিক চাপ বা অন্য সমস্যাতেও একই ধরনের কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তাই সন্দেহের ভিত্তিতে সন্তানকে দোষারোপ না করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তান নেশা করছে জানতে পারলে বাবা-মায়ের আতঙ্কিত বা রাগান্বিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু চিৎকার, অপমান, অতিরিক্ত শাসন কিংবা শারীরিক শাস্তি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এ সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্য, সহমর্মিতা ও সঠিক পদক্ষেপ।
মনোরোগ চিকিৎসক কেদাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরামর্শ, সন্তানকে শারীরিকভাবে আঘাত করা কিংবা ঘর থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি না দিয়ে সহনশীলতার সঙ্গে বিষয়টি বোঝাতে হবে। নেশার কারণে শরীর ও মনে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, সে সম্পর্কেও তাকে সঠিক তথ্য দিতে হবে।
সন্তান যখন নেশার প্রভাবে থাকবে না, তখন একান্তে তার সঙ্গে কথা বলুন। অভিযোগ বা জেরা না করে তাকে বোঝান যে তার আচরণের পরিবর্তন আপনার নজরে এসেছে এবং আপনি তাকে সাহায্য করতে চান।
সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। নেশার পেছনে কোনো মানসিক চাপ, পারিবারিক সমস্যা, বন্ধুত্বের সংকট কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও বোঝার চেষ্টা করুন।
শুধু পারিবারিক বোঝাপড়ায় পরিস্থিতির উন্নতি না হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোরোগ চিকিৎসক, আসক্তি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সন্তানের আচরণে পরিবর্তন দেখলেই আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই; তবে সেটিকে উপেক্ষাও করা উচিত নয়। সময়মতো লক্ষণ চিহ্নিত করে সহানুভূতির সঙ্গে পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়াই তাকে নেশার কবল থেকে বের করে আনার গুরুত্বপূর্ণ পথ।

