যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিশিগান সিনেট নির্বাচন ঘিরে ডেমোক্র্যাট শিবিরে প্রকাশ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। নিজ দলের প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের পাশে না দাঁড়িয়ে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য হ্যালি মারিয়া স্টিভেন্স। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে তাঁর এমন অবস্থান পরিবর্তনে মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে এল-সাইয়েদের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের মূলধারার নেতৃত্বের মতপার্থক্য এবং ইসরাইল ইস্যুতে দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি আবারও সামনে এসেছে।
রোববার (১ নভেম্বর) রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সের প্রতি সমর্থন জানান স্টিভেনস। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে গত আগস্টে ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে আবদুল এল-সাইয়েদের কাছে পরাজিত হন স্টিভেনস। দলীয় নেতৃত্বের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সেই পরাজয় মেনে নিতে হয় তাঁকে। এবার সেই এল-সাইয়েদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে দাঁড়ালেন তিনি।
নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় স্টিভেনস সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনটি যে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, তা সবাই জানেন। তবে আবদুল স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর নির্বাচনী প্রচারে স্টিভেনসের কোনো জায়গা নেই।
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে নেমেছে ডেমোক্র্যাটরা। এই নির্বাচনে মিশিগানের সিনেট আসনটি দলটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অঙ্গরাজ্যটিতে জয় পেলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ অনেকটাই সহজ হতে পারে ডেমোক্র্যাটদের।
এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্টিভেনসের প্রকাশ্য বিরোধিতা দলটির অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যু, পররাষ্ট্রনীতি এবং প্রগতিশীল রাজনীতির অবস্থান নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মূলধারা ও বামপন্থী অংশের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পাওয়া আবদুল এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক ও কূটনৈতিক জোটের কঠোর সমালোচক। ইসরাইলের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এসব অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে স্টিভেনসের সমর্থন প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাননি এল-সাইয়েদ। রোববার তিনি বলেন, হ্যালি স্টিভেনসকে নিয়ে তাঁর বিশেষ কোনো ভাবনা নেই। বরং বাকি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৮ জন মানুষের কথাই তিনি বেশি ভাবছেন।
স্টিভেনস ও রজার্সকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, রাজনীতির চেয়ে নীতিগত বিষয়গুলোই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে স্টিভেনসের সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাট শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার তাঁর এই পদক্ষেপকে ‘ঘৃণ্য বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
মিশিগান ডেমোক্র্যাটদের কৃষ্ণাঙ্গ ককাসের সভাপতিও স্টিভেনসের সমালোচনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, স্টিভেনস নিজেকে এমন একজন সুবিধাবাদী হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি নিজের রাজনৈতিক পথ হারিয়েছেন।
নির্বাচনে জয়ী হলে আবদুল এল-সাইয়েদ হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর। তবে তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে বিতর্ক শুধু দলীয় রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচনী প্রচারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিকবার তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন। ট্রাম্প এল-সাইয়েদকে ‘জিহাদি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামি আইন চালু করতে চান।
অন্যদিকে, স্টিভেনসের রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থনের ঘোষণার পরপরই তাঁর প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘হ্যালি এমন কথা বলেছেন, যা বলার সাহস খুব কম মানুষেরই আছে।’ স্টিভেনসের সিদ্ধান্তকে সাহসিকতা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে স্টিভেনসের এই অবস্থান মিশিগানের সিনেট লড়াইকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। নির্বাচনের আগে প্রকাশিত অধিকাংশ জনমত জরিপে এল-সাইয়েদকে মাইক রজার্সের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তবে দলীয় বিভক্তি শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

