তকদির বা ভাগ্যের ভালো-মন্দে বিশ্বাস করা ঈমানের অঙ্গ। ভাগ্যে বিশ্বাস করা ছাড়া কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ইসলামে ভাগ্যকে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। এর মধ্যে একটি হলো ‘মুবরাম’ ও অন্যটি ‘মুআল্লাক’। আরবি শব্দ মুবরাম অর্থ চূড়ান্ত বা অপরিবর্তনশীল। আর মুআল্লাক অর্থ ‘ঝুলন্ত বা লটকানো’।
সহজ কথায়, মহান আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার ভাগ্য নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি তা পরিবর্তন করার ক্ষমতাও রাখেন। এর মধ্যে কিছু বিষয় নির্ধারিত। আর কিছু বিষয় ঝুলন্ত বা লটকানো অবস্থায় রয়েছে, যেগুলো বান্দার নেক আমলের মাধ্যমে, বাবা-মায়ের দোয়ায় কিংবা সদকা ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবর্তন হয়।
হাদিসে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- কেবল সৎ কর্মই আয়ু বৃদ্ধি করে এবং দোয়া ছাড়া অন্য কিছুতেই তকদির রদ হয় না। মানুষের অসৎ কর্মই তাকে রিজিক বঞ্চিত করে। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৯০; সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ২১৩৯)
তবে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে অনেকেই নানা ধরনের বিপদ-আপদে পড়ে নিরাশ হয়ে ভাগ্যকে দোষরোপ করে থাকেন। কেউ কেউ বিপদ-আপদকে নিজের ‘খারাপ সময়’ বলেও আখ্যা দেন। তবে বিপদ-আপদ বা কষ্টকর সময়কে সরাসরি ‘খারাপ সময়’ বা সময়কে দোষ দেয়া ইসলামে জায়েজ নেই।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, রাসুল (সা.)-কে আমি বলতে শুনেছি- মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহ বলেন, আদম সন্তান সময় ও কালকে গালমন্দ করে, অথচ আমিই সময়, আমার হাতেই রাত ও দিন (এর বিবর্তন সাধিত হয়)। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৬৬৭) এজন্য খোদ রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন সময়ে উম্মতদের বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণের পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে ভাগ্যসহ যেকোনো বিষয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা হতাশা থেকে মুক্তি চেয়ে মহান রবের কাছে আশ্রয় প্রার্থনাও শিখিয়েছেন নবীজি (সা.)।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা ভয়াবহ বিপদ, হতভাগ্যের অতল গহবর, মন্দ তকদির এবং শত্রুর আনন্দ প্রকাশ থেকে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর’। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৬৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৬৩০)
এজন্য ভাগ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা নিরাশ না হয়ে মহান রবের কাছে দোয়ার পাশাপাশি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত নিচের আয়াতগুলোর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে পারেন। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, মহান রাব্বুল আলামিন অত্যন্ত দয়াময়। বিভিন্ন সময়ে তিনি বান্দার নানা পরীক্ষা যেমন নিয়ে থাকেন, তেমনি ক্ষমার পাশাপাশি সঠিক পথে চললে সেই পথ সুগম করে দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন।
১) ‘আর আমি (মহান আল্লাহ তা’য়ালা) অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা তাদের যখন বিপদ আক্রান্ত করে, তখন বলে- নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫-১৫৬)
২) ‘অবশ্যই তোমাদেরকে তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের নিজ জীবন সম্পর্কে পরীক্ষা করা হবে। আর অবশ্যই তোমরা শুনবে তোমাদের পূর্বে যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে এবং মুশরিকদের পক্ষ থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে নিশ্চয়ই তা হবে দৃঢ় সংকল্পের কাজ।’ (সুরা ইমরান, আয়াত: ১৮৬)
৩) ‘আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে (রাসুল সা.) আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয়ই নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং, তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)
৪) ‘নিশ্চয়ই তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকারের। অতএব যে ব্যক্তি (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) দান করে ও (আল্লাহকে) ভয় করে, আর উত্তমকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে, আমি তার জন্য সহজ পথে চলা সুগম করে দেবো।’ (সুরা আল-লাইল, আয়াত: ৪-৭)
৫) ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। সে যা অর্জন করে, তা তার জন্যই এবং সে যা কামাই করে, তা তার ওপরই বর্তাবে। হে আমাদের রব! আমরা যদি ভুলে যাই, অথবা ভুল করি, তাহলে আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না। হে আমাদের রব, আমাদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দেবেন না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। হে আমাদের রব, আপনি আমাদের এমন কিছু বহন করাবেন না, যার সামর্থ্য আমাদের নেই। আর আপনি আমাদের মার্জনা করুন এবং আমাদের ক্ষমা করুন, আর আমাদের ওপর দয়া করুন। আপনি আমাদের অভিভাবক। অতএব আপনি কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)

