জান্নাত মুমিনের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তি। কোরআন ও হাদিসে মুমিনদের জান্নাতের পথে চলতে উদ্বুদ্ব করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জান্নাত মুমিনের জীবনের বড় সাফল্য। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেছেন, আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন সব বস্তু বানিয়ে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো অন্তঃকরণ চিন্তা করেনি।
হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তোমরা চাইলে এ আয়াত তিলাওয়াত করো: ‘কেউ জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কোনো বিষয় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। (সুরা সাজদা, আয়াত: ১৭; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৭৯)
যেভাবে বরণ করা হবে
পরকালে জান্নাতিদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে জান্নাতে স্বাগত জানানো হবে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে জান্নাতিদের স্বাগত জানানোর পদ্ধতি তুলে ধরা হলো-
১. সালামের মাধ্যমে: শান্তির বার্তা সালামের মাধ্যমে জান্নাতিদের স্বাগত জানানো হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা জান্নাতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে প্রবেশ করো।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৪৬)
২. জান্নাতের দ্বাররক্ষীর উপস্থিতি: জান্নাতের দ্বাররক্ষী নিজে উপস্থিত থেকে জান্নাতিদের স্বাগত জানাবেন। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তারা জান্নাতের কাছে উপস্থিত হবে ও তার দ্বারগুলো খুলে দেওয়া হবে। জান্নাতের রক্ষীরা তাদের বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম। তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কোরো স্থায়ীভাবে অবস্থিতির জন্য।’ (সুরা ঝুমার, আয়াত: ৭৩)
৩. নেক আমলের জন্য অভিনন্দন: জান্নাতে প্রবেশের সময় জান্নাতিদের নেক আমলের অভিনন্দন জানানো হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘ফেরেশতারা তাদের কাছে উপস্থিত হবে প্রত্যেক দ্বার দিয়ে এবং বলবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছ বলে তোমাদের প্রতি শান্তি। কত ভালো এই পরিণাম!’ (সুরা রাআদ, আয়াত: ২৩-২৪)
৪. ফেরেশতাদের উপস্থিতি: জান্নাতিদের স্বাগত জানাতে ফেরেশতারা উপস্থিত হবে। আল্লাহ বলেন, ‘ফেরেশতারা তাদেরকে অভ্যর্থনা করবে এই বলে, এই তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছিল।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০৩)
৫. অবারিত ভোগসম্ভারের অধিকার প্রদান করে: জান্নাতে প্রবেশের সময় আল্লাহ জান্নাতিদের অবারিত সুখ, শান্তি ও ভোগসম্ভারের ভোগাধিকার দেবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘সেদিন নিশ্চয়ই মুত্তাকিরা থাকবে প্রস্রবণ বিশিষ্ট জান্নাতে, উপভোগ করবে তা যা তাদের প্রতিপালক তাদের দেবেন। কারণ পার্থিব জীবনে তারা ছিল সৎকর্মপরায়ণ।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ১৫-১৬)
জান্নাত লাভে সহায়ক আমল
কোরআন ও হাদিসে জান্নাত লাভে সহায়ক আমলের বর্ণনা এসেছে। যার কয়েকটি তুলে ধরা হলো-
১. ইহসান: ইহসান হলো নিষ্ঠাপূর্ণ নেক আমলের মাধ্যমে নিজের ও সমগ্র সৃষ্টির প্রতি দয়া করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(জান্নাতে তারা) উপভোগ করবে তা যা তাদের প্রতিপালক তাদেরকে দেবেন। কেননা পার্থিব জীবনে তারা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। তারা রাতের সামান্য অংশই অতিবাহিত করত নিদ্রায়, রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত: ১৬-১৮)
২. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য চেষ্টা করা: আল্লাহর সন্তুষ্টিই জান্নাতের প্রধান উপায়। আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিন হয়ে পরকাল কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১৯)
৩. নেক কাজে প্রতিযোগিতা করা: যারা নেক কাজে প্রতিযোগিতা করে এবং একে অপরকে ছাড়িয়ে যেতে চায়, আল্লাহ পরকালে তাদের জান্নাত দান করবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘এই বিষয়ে (আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন মুক্তি লাভে) প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ২৬)
৪. ফরজ নামাজ আদায়: ঈমানের পর নামাজই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। নামাজ জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। মহানবী (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা বান্দার ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি এই নামাজগুলো যথাযথভাবে আদায় করবে এবং অবহেলাবশত তাতে কোনো ত্রুটি করবে না, তার সঙ্গে আল্লাহ তাআলার চুক্তি হয়েছে যে তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৪২০)
৫. সামাজিক শিষ্টাচার ও দায়িত্ব পালন: মুমিন সামাজিক শিষ্টাচার, সামাজিক দায়িত্ব ও গোপন ইবাদতের মাধ্যমে পরকালে জান্নাত লাভ করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হে লোক সকল ! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাবার খাওয়াও এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন (শেষ রাতে) নামাজ পড়ো। তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৮৫)
৬. সংযম ও সম্ভ্রম রক্ষা করা: মুখের জবান ও লজ্জাস্থান মুমিনের জান্নাত লাভের মাধ্যম। নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জিহ্বা ও লজ্জাস্থান হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের দায়িত্ব নেব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৪)
জান্নাতই সাফল্য
জান্নাতই মুমিনের জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম এবং পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া কিছুই না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)
হে আল্লাহ! আপনি দয়া করে আমাদের জান্নাতের অধিবাসী করুন। আমিন।

