spot_img

মার্কিন নেতৃত্বাধীন এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনে চাই ‘চার মূলনীতিতে ঐক্য’

অবশ্যই পরুন

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের আসলি বালি ও স্যামুয়েল ময়েন ‘আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বদলে কী ধরনের ব্যবস্থা আসা উচিত?’ শীর্ষক কলামে মার্কিন নেতৃত্বাধীন চলমান এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা আশু করণীয় হিসেবে তার প্রস্তাবিত চারটি মূলনীতিতে ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। তারা মনে করেন, এখন সময় এসেছে পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার জন্য মায়াকান্না বন্ধ করে একটি নতুন বহুপাক্ষিক বিশ্বের ভিত্তি গড়ে তোলার।

তাদের মতে, আমেরিকা ক্রমেই তার প্রভাব হারাচ্ছে। এর সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ছে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা। যদিও আমেরিকার এই পতনের সঙ্গে প্রকৃত ঝুঁকি রয়েছে, তবুও এটিই সম্ভবত সবচেয়ে উপযুক্ত সময়, যখন স্পষ্টভাবে বলতে হবে যে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা কখনোই আদর্শ ছিল না, এবং এমন একটি বহুপাক্ষিক প্রত্যাশিত বিশ্ব, যা হয়তো আগের ব্যবস্থার তুলনায় ভালোভাবে বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে পারে।

১৯৪৫ সালের পর প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত ‘আমেরিকান শান্তি’ এবং ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’কে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরা বর্তমান বাস্তবতার একটি ভুল প্রতিক্রিয়া। শাসনতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা কথাটি অনেক পরে প্রচলিত হলেও সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি সর্বদাই কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত ছিল। তা আজকে অতীতকে ফিরিয়ে আনার এক ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।

উদারপন্থী ভাষ্যকাররা আটলান্টিক জোটের দুর্বল হয়ে পড়া নিয়ে শোক প্রকাশ করছেন, হারিয়ে যাওয়া বহুপাক্ষিকতাকে আবেগপ্রবণভাবে রক্ষা করতে চাইছেন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ‘নৈতিকতার নামে’ নতুন যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। যখন তাদের বিরুদ্ধে অতীতকে অতিরঞ্জিতভাবে মহিমান্বিত করার অভিযোগ ওঠে, তখন তারা বলেন—হ্যাঁ, পুরোনো বিশ্বব্যবস্থায় ভণ্ডামি ছিল, কিন্তু অন্তত সেই ভণ্ডামি উচ্চ আদর্শের নামে করা হতো।

২০২৬ সালে ডাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বক্তব্যকে অনেকেই সাহসী সততা হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন, কারণ তিনি স্বীকার করেছিলেন যে মহান শক্তিগুলোর ক্ষেত্রে আদর্শ ও নিয়মের কথাগুলো আসলে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের সুখকর মিথ ছিল। কিন্তু এটি নতুন কিছু ছিল না। বরং কার্নি ভুল করেছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন যে সেই মিথ একসময় পৃথিবীকে আরও ভালো করেছিল।

আটলান্টিক বিশ্বের বাইরে খুব কম মানুষই কখনো প্যাক্স ‘আমেরিকানা’কে আদর্শ বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে দেখেছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্পের ইরানে হামলাকে সমর্থনের মধ্য দিয়ে তার বক্তব্যের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পায়।

উচ্চ আদর্শের আড়ালে থাকা পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা কখনোই ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর জন্য যথেষ্ট ভালো ছিল না। কেবলমাত্র একজন স্পষ্টভাষী প্রেসিডেন্টের কারণে সেটি নষ্ট হয়ে যায়নি; বরং সমস্যাগুলো ছিল কাঠামোগত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতীতের সেই ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা শুধু অযৌক্তিক নয়, বাস্তবেও আর সম্ভব নয়; সেটাই উত্তম। এর পরিবর্তে এখন দরকার এমন একটি যুদ্ধবিরোধী আন্তর্জাতিক কর্মসূচি, যা অনিবার্যভাবে বহুপাক্ষিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বের উপযোগী হবে।

যুদ্ধবিরোধী নতুন বিশ্বব্যবস্থার চারটি মৌলিক অঙ্গীকার

১. আত্মরক্ষার অধিকারের সীমা পুনর্নিশ্চিত করা

রাষ্ট্রগুলোর উচিত জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকারের সীমা পুনরায় নিশ্চিত করা এবং আরও শক্তিশালী করা। আত্মরক্ষার অধিকার কখনোই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হুমকি, দুর্বল প্রতিরোধক্ষমতা বা অস্পষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগের অজুহাতে আগাম হামলার বৈধতা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি।

আসন্ন হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সীমা ভেঙে গেলে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখিয়ে প্রথমে আঘাত হানার দাবি করতে পারবে।

একইভাবে, ‘কোনো রাষ্ট্র যদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণে অক্ষম বা অনিচ্ছুক হয়, তবে তার ভূখণ্ডে হামলা করা আত্মরক্ষার অংশ’—এই মতবাদও প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

২. শক্তি প্রয়োগ করে ভূখণ্ড দখলের বিরুদ্ধে অবস্থান

রাষ্ট্রগুলোর পুনরায় ঘোষণা করা উচিত যে যুদ্ধ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোনো ভূখণ্ড দখল বা সংযুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এটি শুধু সরাসরি দখলের ক্ষেত্রেই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি দখল, বসতি স্থাপন, জনসংখ্যার পরিবর্তন বা ধীরে ধীরে বাস্তবতা সৃষ্টি করে কার্যত সংযুক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

যদি বহুপাক্ষিক বিশ্ব পারস্পরিক সংযমের বদলে আঞ্চলিক আধিপত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তবে ছোট রাষ্ট্রগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। ভেনেজুয়েলা, কিউবা, গ্রিনল্যান্ড কিংবা কানাডা সম্পর্কিত মার্কিন হুমকি এ ধরনের ঝুঁকির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাধানের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য।

৩. প্রক্সি যুদ্ধ বন্ধ করা

বড় ও মাঝারি শক্তিগুলোর উচিত একে অপরের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করা, উসকে দেওয়া বা দীর্ঘায়িত না করার অঙ্গীকার করা। আগ্রাসনের শিকার কোনো রাষ্ট্রকে আত্মরক্ষায় সহায়তা করা এক বিষয়, কিন্তু যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করার কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো সরাসরি দায় এড়িয়ে গেলেও, এর ফলে অসংখ্য সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং বড় যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ে।

৪. আগ্রাসন বা নৃশংসতায় সহায়ক অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করা

রাষ্ট্রগুলোর উচিত এমন সামরিক সহায়তা বা অস্ত্র বিক্রি না করা, যা আগ্রাসন, যুদ্ধাপরাধ বা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনকে উৎসাহিত করে।

যখন শক্তিশালী দেশগুলো এমন অংশীদারদের অস্ত্র দেয় যারা আগ্রাসী যুদ্ধ চালায় বা সাধারণ মানুষের ওপর ব্যাপক ক্ষতি করে, তখন স্থানীয় যুদ্ধ আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। গাজা ও ইউক্রেনের যুদ্ধকে লেখক এ ধরনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম বড় ব্যর্থতা হলো আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারা।

২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয় প্রায় ২.৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই প্রেক্ষাপটে আর্মস ট্রেড ট্রিটি (এটিটি)-এর মতো চুক্তিকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে শুধু গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধ নয়, বরং আগ্রাসন বা অবৈধ ভূখণ্ড দখলকে সহায়তা করে এমন অস্ত্র স্থানান্তরও নিষিদ্ধ হয়।

এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য পুরো ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার নকশা নির্ধারণ করা নয়। বরং সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলোতে ন্যূনতম ঐকমত্য গড়ে তোলা।

যার চার মূলনীতি হলো—

আত্মরক্ষার নামে প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ নয়।
শক্তি প্রয়োগ করে কোনো ভূখণ্ড দখল নয়।
অন্য দেশের মাটিতে প্রক্সি যুদ্ধ নয়।
আগ্রাসন বা নৃশংসতাকে সহায়তা করে এমন অস্ত্র সরবরাহ নয়।

লেখকের মতে, এগুলো কোনো অবাস্তব আদর্শ নয়; বরং এমন এক বিশ্বের ন্যূনতম শর্ত, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো যুদ্ধকে রাজনীতির স্বাভাবিক হাতিয়ারে পরিণত না করে প্রতিযোগিতা করতে পারে।

বহুপাক্ষিক বিশ্বকে কেবল আমেরিকান নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার পতন হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি হয়তো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর নতুন আধিপত্যের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ার সুযোগও এনে দেয়, যা একক কোনো পরাশক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়, দ্বৈত মানদণ্ডে কলুষিত নয় এবং অতীতের ভণ্ডামিকে আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।

সর্বশেষ সংবাদ

ইরাকের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন সবচেয়ে ভালো অবস্থানে’: আরাঘচি

প্রতিবেশী ইরাকের সাথে ইরানের বর্তমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সবচেয়ে সুদৃঢ় ও সেরা অবস্থানে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ