মানুষের জীবন যত আধুনিক হচ্ছে, ততই যেন নতুন নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি সামনে আসছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও গবেষণার আলোচনায় উঠে এসেছে, কিছু টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ। এই ক্ষুদ্র কণাগুলো খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন।
আধুনিক জীবনের নানা সুবিধার আড়ালে যখন এমন অজানা ঝুঁকি সামনে আসছে, তখন একজন মুসলমানের মন অনায়াসেই ফিরে যায় সেই মহান শিক্ষকের দিকে, যিনি চৌদ্দশ বছর আগে এমন একটি প্রাকৃতিক, নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও বরকতময় উপায় শিখিয়ে গেছেন, যার নাম মেসওয়াক।
এটি শুধু একটি গাছের ডাল নয়; এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসার একটি সুন্নাহ, যা পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য এবং ইবাদতের এক অনন্য সমন্বয়। আজ বিজ্ঞান যখন প্রাকৃতিক উপায়ের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করছে, তখন একজন মুমিনের জন্য মেসওয়াকের গুরুত্ব আরও গভীরভাবে অনুভব করার সময় এসেছে। কেননা ইসলাম মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা সর্বদা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন। (সুরা: বাকারা, আয়াত: ২২২)
পবিত্রতা ইসলামের সৌন্দর্য। আর মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতা সেই পবিত্রতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) মেসওয়াককে এমন মর্যাদা দিয়েছেন, যা অন্য কোনো দৈনন্দিন অভ্যাসকে খুব কমই দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টকর মনে না করতাম, তবে প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৭)
ভাবুন, একটি আমলকে যদি ফরজ করে দেওয়া না হয় শুধুমাত্র উম্মতের কষ্টের কথা বিবেচনা করে, তাহলে সেই আমলের গুরুত্ব কতখানি! এটি প্রমাণ করে, মেসওয়াক শুধু দাঁত পরিষ্কারের একটি মাধ্যম নয়; এটি এমন একটি সুন্নাহ, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইবাদতের প্রস্তুতি, পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।
অন্য একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মেসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৮৯)
কত গভীর এই বাণী! আধুনিক টুথপেস্ট মুখ পরিষ্কার করতে পারে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির সুসংবাদ দিতে পারে না। মেসওয়াক একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতার উপকরণ, সুন্নাহর অনুসরণ এবং সওয়াবের উৎস।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রতিদিন নতুন নতুন রাসায়নিক উপাদান আমাদের জীবনে যুক্ত হচ্ছে। খাবার থেকে প্রসাধনী সবকিছুতেই কৃত্রিম উপাদানের আধিক্য। এখন টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির বুকে লুকিয়ে থাকা আল্লাহর দেওয়া সহজ ও নিরাপদ নিয়ামতগুলোর মূল্য কত বড়। মেসওয়াক এমনই একটি নিয়ামত, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে পরিচ্ছন্নতা ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হয়ে আছে।
মেসওয়াকের সবচেয়ে বড় বৈশষ্ট্যি হলো, এটি কৃত্রিম রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি সহজ, প্রাকৃতিক, পরিবেশবান্ধব এবং সুন্নাহসম্মত। নিয়মিত মেসওয়াক ব্যবহারে দাঁত পরিষ্কার থাকে, মুখের দুর্গন্ধ কমে, মাড়ি সুস্থ রাখতে সহায়তা করে এবং মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে। এর চেয়েও বড় কথা, প্রতিবার মেসওয়াক ব্যবহার করার সময় একজন মুসলমান সুন্নাহ পালনের সওয়াব লাভ করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা অনেকেই সুন্নাহকে পুরোনো মনে করে আধুনিকতার পেছনে ছুটেছি। অথচ আধুনিক বিশ্ব আজ সেই প্রাকৃতিক জীবনধারার প্রতিই আবার ফিরে যেতে শুরু করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) যে পথ দেখিয়েছেন, সেটি আজও সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, স্বাস্থ্যকর ও কল্যাণকর পথ।

