ভারতের নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার নিয়োগ দিয়েছে সরকার। সাংবাদিক সাইদুর রহমানকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২০ জুলাই) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। আগামী এক বছরের জন্য তাকে প্রেস মিনিস্টার পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো সাংবাদিক ফয়সাল মাহমুদকে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেয়া সেই নিয়োগ চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকার বাতিল করে। তার দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এতদিন এই পদটি ফাঁকা ছিলো।
নতুন নিয়োগ পাওয়া সাংবাদিক সাইদুর রহমান বিগত ফ্যাসিবাদ বিরোধী শাসনামলে সত্যের সন্ধানে এক নির্ভীক কলমযোদ্ধা হিসাবে কাজ করে গেছেন। সর্বশেষ জুলাই-আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। আন্দোলন যখন তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে একটি আন্দোলনের দিকনির্দেশনা নিয়ে সাইদুর রহমানের কথোপকথনের একটি অডিও ভাইরাল হয়। স্যোশাল মিডিয়ায় সবর্দা প্রতিবাদী এবং সোচ্চার সাংবাদিক হিসাবে পরিচিত তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন সাইদুর রহমান। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় সাংবাদিকতা শুরু করেন তিনি। ছাত্রদলের রাজনীতি করা অবস্থায় ২০০৫ সালের শেষদিকে তৎকালীন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল ও সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর সুপারিশে বিএনপি মুখপাত্র দৈনিক দিনকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টার হিসাবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। এরপর ২০০৭ সালে যোগ দেন ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ইত্তেফাকে। ২০০৭ সালে ছাত্রজনতার বিক্ষোভে মাঠে থেকে সহযোগিতা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১০ সালে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর তার উপর শুরু হয় ফ্যাসিবাদী খড়গ।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে আরটিভিতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের সাথে বাকবিতান্ডায় জড়িয়ে পড়ার কারণে টকশোতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় সাইদুর রহমানকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০২৩ সালে আরএফইডির সভাপতি নির্বাচিত হন। এই সময় তার উপর কাওরান বাজারে হামলা হয়। হামলা করা হয় তার ঢাকার বাসায়। তার মেয়াদে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনে তিনি সাংবাদিকদের প্রতিবাদী করে তোলেন। নির্বাচন কমিশনে বৈরি পরিবেশের সম্মুখীন হন তিনি। নির্বাচনের আগে তাকে ইত্তেফাকের একটি সংবাদের সূত্র ধরে কারণ দর্শানো নোটিশ করে নির্বাচন কমিশন।
স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি ও জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে কলারোয়া থানায় ২০২৪ সালেন ২৯ জুলাই অভিযোগ দায়ের করা হয়। ভিন্নমতালম্বীর কারণে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় দৈনিক ইত্তেফাকে স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ৫ই আগস্টের পর পদোন্নতি পেয়ে ইত্তেফাকের রাজনীতি ও নির্বাচন বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। একই সাথে তিনি ইত্তেফাকের ইউনিট চিফ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কলারোয়ার কাজীরহাট কলেজের গর্ভনিং বডির আহবায়ক ছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনার ক্রিয়েটিভ এন্ড আর্টস এবং ফ্যাক্ট চেকিং উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন সাইদুর রহমান। শত প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তিনি দায়িত্বশীলতার সাথে সাংবাদিকতা করে গেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে সহকর্মী ও পাঠকদের কাছে সম্মান অর্জন করেছেন। শ্রেষ্ঠ রিপোর্টিংয়ের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি কর্তৃক প্রদত্ত চিশতি শাহ হেলালুর রহমান পদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশন কর্তৃক প্রদত্ত জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমদ পদক, এডুকেশন ওয়াচ কর্তৃক প্রদত্ত বেষ্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড, নির্বাচন কমিশনে সাংবাদিকদের সংগঠন আরএফইডি প্রদত্ত সাংবাদিক হোসাইন জাকির স্মৃতি পদক পান। সাংবাদিকতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, চিন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, ভারত, নেপাল, ভূটান ইত্যাদি দেশ ভ্রমণ করেন তিনি।
সাংবাদিক সাইদুর রহমানের জন্ম সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজলার কুশোডাঙ্গা গ্রামে। স্থানীয় হেলাতলা আইডিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি এবং কাজীরহাট কলেজ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। বাবা মোসলেম সরদার এবং মা সালেহা খাতুন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। ব্যক্তি জীবনে তিনি বিবাহিত। একপুত্র এবং এক মেয়ের জনক।
সত্যের প্রতি অঙ্গীকার, ন্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জনকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা-এই তিন গুণই সাংবাদিক সাইদুর রহমানকে একজন সম্মানিত সংবাদকর্মী হিসেবে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। নতুন দায়িত্ব তার কলমকে ভবিষ্যতেও সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

