spot_img

তায়েফের বুকে যে মসজিদ মুসলিমদের জন্য এক টুকরো সান্ত্বনা

অবশ্যই পরুন

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেগুলো শুধুমাত্র স্থাপত্যের কারণে নয়, বরং ঈমান, ধৈর্য ও আল্লাহর রহমতের অবিস্মরণীয় স্মৃতির কারণে যুগে যুগে মুসলমানদের হৃদয়ে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। সৌদি আরবের তাইফ শহরে অবস্থিত মসজিদ আদ্দাস তেমনই একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন।

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, এখানেই নবী মুহাম্মদ (সা.) তাইফবাসীর নির্মম নির্যাতন ও প্রত্যাখ্যানের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলেন। আর এখানেই ঘটে যায় এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনা—যা একজন খ্রিস্টান ক্রীতদাসের হৃদয়ে ইসলামের আলো জ্বালিয়ে দেয়।

নবুওয়তের দশম বছরে, মহানবী (সা.) প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিবের ইন্তেকালের পর ইসলামের দাওয়াত নিয়ে তাইফে যান। কিন্তু সেখানে তিনি প্রত্যাশিত সাড়া তো পানইনি, বরং শহরের প্রভাবশালীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে।

উসকানি দিয়ে শিশু ও দুর্বৃত্তদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হয়। তারা পাথর নিক্ষেপ করতে করতে তাঁকে শহরের বাইরে বের করে দেয়। এতে তাঁর পবিত্র শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায় এবং জুতা পর্যন্ত রক্তে ভিজে যায়।

মহানবী (সা.) রক্তাক্ত আর ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে শহরের অদূরে অবস্থিহ একটি আঙুর বাগানে আশ্রয় নেন।

দূর থেকে তাঁর অবস্থা দেখে বাগানের মালিকরা তাদের খ্রিস্টান ক্রীতদাস আদ্দাস-কে এক থোকা আঙুর দিয়ে তাঁর কাছে পাঠান। আদদাস যখন আঙুরের পাত্র নবীজির সামনে রাখল, তিনি খাওয়ার আগে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ্’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি)। শুনে আদদাসকে থমকে গেল। তায়েফ বা মক্কার পৌত্তলিকরা এভাবে কথা বলে না। সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই উপত্যকার মানুষ তো এমন কথা বলে না।

আপনি কে? মহানবী (সা.) পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার আদি বাড়ি কোথায়, তোমার ধর্ম কী?’ আদদাস জবাব দিল, ‘আমি ইরাকের নিনেভা শহরের এক খ্রিষ্টান।’ নিনেভার নাম শুনে নবীজির রক্তাক্ত মুখেও এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘তুমি তবে সেই পুণ্যবান নবী ইউনুস ইবনে মাত্তার শহরের লোক!’ আদদাস আরও অবাক, এই মরুভূমির মানুষ ইউনুসের নাম জানার কথা নয়। মহানবী (সা.) বললেন, ‘ইউনুস ছিলেন আমার ভাই। তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, আমিও আল্লাহর নবী।’

এই একটি বাক্য জাগিয়ে তুলল আদদাসের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা বিশ্বাস। সে বুঝে গেল, সামনে বসা মানুষটি মক্কার কোনো সাধারণ নেতা নন। তিনি সেই শেষ নবী, যাঁর কথা তার নিজের কিতাবেও লেখা আছে। সে নবীজির হাতে, পায়ে, কপালে চুমু খেতে লাগল। দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে উতবা-শাইবা আফসোস করে বলল, ‘সর্বনাশ, লোকটা আমাদের দাসকেও নষ্ট করে দিল!’ ফিরে আসার পর তারা আদদাসকে জিজ্ঞেস করল, কেন সে ওভাবে চুমু খাচ্ছিল। আদদাস দৃঢ়ভাবে জবাব দিল, ‘এই পৃথিবীতে এই মানুষটির চেয়ে উত্তম আর কেউ নেই। তিনি আমাকে এমন এক সত্য বলেছেন, যা একজন নবী ছাড়া কেউ জানতে পারে না।’

এই তাৎক্ষণিক ইসলাম গ্রহণ ছিল তায়েফের সেই অন্ধকার দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক টুকরো সান্ত্বনা। সেই আঙুর বাগানের জায়গাতেই পরে গড়ে ওঠে একটি মসজিদ—মসজিদে আদদাস। বাহ্যিক ব্যর্থতার আড়ালে আসলে সফলতা লুকিয়ে থাকে। পুরো তায়েফ শহর নবীজিকে তাড়িয়ে দেয়, অথচ আল্লাহ ঠিক তখনই একজন সাধারণ দাসের অন্তর খুলে দেন। তাই আজও তায়েফে যারা বেড়াতে যান, তারা মসজিদ আদদাসের শান্ত পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হন, অস্থির হৃদয়ে সান্ত্বনা লাভ করেন। বুঝতে পারেন, যখন দুনিয়ার সব মানুষ বিপক্ষে চলে যায়, চারপাশ তাড়িয়ে দেয়, তখনও আল্লাহর রহমতের একটা আঙুরের থোকা আর একজন বিশ্বস্ত আদদাস কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করে থাকে।

তথ্যসূত্র : (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড ৩, পৃ. ১৩২, সীরাতে ইবনে হিশাম, সিরাতুন নবাবিয়্যাহ, ২/৭১, ইবনুল আসির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, খণ্ড ১, পৃ. ৬৬০)

সর্বশেষ সংবাদ

মিয়ানমারের উপকূলে নৌকাডুবি, ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারের উপকূলে দুটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। গত জুন মাসের শেষের দিকে ও চলতি জুলাইয়ের প্রথম দিকে...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ