মার্কিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফার কাছে লবিং করেছিলেন যাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়ার কারণে তিনি নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।
তবে রোববার চমকপ্রদ ঘোষণায় জানানো হয়, সোমবার রাতে সিয়াটলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে সহ-আয়োজকদের শেষ ষোলোর ম্যাচে তিনি খেলতে পারবেন।
গার্ডিয়ানকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বুধবার থেকে শুরু করে ট্রাম্প এ বিষয়ে ফিফাকে তিনবার ফোন করেছিলেন যাতে সিদ্ধান্তটি পরিবর্তন করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত মাঠে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের শক্তি জুগিয়েছে। তারা ২০০২ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার চেষ্টা করছে। বালোগুন এ পর্যন্ত টুর্নামেন্টে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ধারাবাহিক আক্রমণভাগের খেলোয়াড়, তিনটি ম্যাচেই শুরু থেকে খেলেছেন এবং তিনটি গোল করেছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘যা সঠিক ছিল তা করার জন্য এবং একটি বড় অন্যায়ের সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ!’
ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি জানিয়েছে, তারা ফিফা ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধারায় ম্যাচ-ফিক্সিং-সংক্রান্ত নয় এমন ক্ষেত্রে লাল কার্ডের শাস্তি স্থগিত করার সুযোগ রয়েছে। তবে বালোগুনকে এক বছরের জন্য পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। অর্থাৎ লাল কার্ডটি তার রেকর্ডে থাকবে। এই সময়ের মধ্যে যদি তিনি একই ধরনের ও সমপর্যায়ের আরেকটি অপরাধ করেন, তাহলে তাকে সেই এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা ভোগ করতে হবে।
এর আগে পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও একই ২৭ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ার পরও তাকে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচগুলোতে খেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
রয়্যাল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) এক বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তে ‘বিস্মিত’ হওয়ার কথা জানায়। পরে তারা উল্লেখ করে, লাল কার্ডের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞার যে ফিফা বিধান রয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা জানায়, সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে।
বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া ফিফার এই সিদ্ধান্তকে এপ্রিল ফুলের কৌতুকের সঙ্গে তুলনা করেন।
তিনি ফরাসি ভাষায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি জানতাম না ৫ জুলাই ফিফায় ১ এপ্রিল (এপ্রিল ফুল দিবস)-এর সমান। আমি মনে করি, আমাদের ফেডারেশনের বিবৃতির দিকেই তাকানো উচিত। সেখানে অনেক বিষয় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। ফেডারেশন শুধু নিজেদের বা জাতীয় দলকে রক্ষা করছে না; তারা ফুটবল, এর সততা ও নৈতিকতাকে রক্ষা করছে।’
ইউএস সকারের এক মুখপাত্র জানান, বালোগুনকে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলানোর প্রক্রিয়ায় সংস্থাটি যুক্ত ছিল।
কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোও ফিফার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। তিনি পুনরায় বলেন, বালোগুনকে লাল কার্ড দেখানোর সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত কঠোর ছিল।
তিনি বলেন, ‘যারা সত্যিই ফুটবলকে ভালোবাসে এবং নৈতিকতা ও সততায় বিশ্বাস করে, তারা সবাই এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাবে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে আমরা ৩০ মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলেছি এমন একটি সিদ্ধান্তের কারণে, যা সম্পূর্ণ অন্যায্য ছিল। আমার বিশ্বাস, ৯৯.৯ শতাংশ মানুষই একে অন্যায্য লাল কার্ড হিসেবে দেখেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়রা জানান, অনুশীলনে যাওয়ার পথে দলীয় বাসেই তারা বালোগুনের খেলার অনুমতির খবর পান।
ডিফেন্ডার ক্রিস রিচার্ডস বলেন, ‘কেউ ক্ল্যাশ রয়্যাল খেলছিল, কেউ গান শুনছিল। এর মধ্যেই খবরটা আসে। আমার পরিবার সম্ভবত আমাকে আটটি টুইট পাঠিয়েছিল। আগে কেউ আমাদের কিছু জানায়নি। এখন এআই-এর যুগে অনেক খবর নিয়েই সন্দেহ থাকে। শেষ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই নিশ্চিত হই যে খবরটি সত্য।’
তিনি আরও বলেন, প্রথমে খবর পাওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর, অনুশীলনের মাঠে বাস থেকে নামার সময় ইউএস সকারের এক কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রিচার্ডস মজা করে বলেন, ‘সে (বালোগুন) এখন খুবই শান্ত থাকার ভান করছে। আমরা আক্রমণভাগে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তার ওপর নির্ভর করি। টুর্নামেন্টজুড়ে সে দারুণ খেলেছে। তাই সিদ্ধান্তটি বদলে যাওয়ায় আমরা খুবই খুশি ও উত্তেজিত। স্পষ্টতই তারা বুঝেছে যে আগের সিদ্ধান্তে ভুল ছিল।’
রিচার্ডস, ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ এবং অ্যালেক্স ফ্রিম্যান জানান, বালোগুনের নিষেধাজ্ঞার কারণে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের প্রস্তুতি ও অনুশীলনে কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। তারা তাকে ছাড়াই খেলার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
ইউএস সকার এক বিবৃতিতে জানায়, ‘শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিচ্ছি এবং ফোলারিন বালোগুন আগামীকালের ম্যাচে খেলতে পারবে জেনে আমরা আনন্দিত।’
বুধবার শেষ-৩২-এর ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় বালোগুন লাল কার্ড দেখেন। শুরুতে কোনো ফাউল দেওয়া হয়নি। পরে ভিডিও সহকারী রেফারি (ভিএআর) লক্ষ্য করেন যে তিনি প্রতিপক্ষের গোড়ালিতে পা রেখেছেন এবং রিভিউয়ের পরামর্শ দেন। ভিডিও দেখে রেফারি গুরুতর ফাউলের অভিযোগে সরাসরি লাল কার্ড দেখান।
এই সিদ্ধান্তে ধারাভাষ্যকার, যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফ সবাই বিস্মিত হন। তাদের মতে, ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত।
পুলিসিচ বলেন, ‘এটাই সঠিক মনে হচ্ছে। বালো পুরো বিষয়টি দারুণভাবে সামলেছে, দলও তাই করেছে। আমরা অভিযোগ নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনি। সঠিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলে ভালো জিনিসই ঘটে।’
এর আগে ফিফা ও ইউএস সকার (ফুটবল) কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, লাল কার্ডের সঙ্গে যুক্ত এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই।
শুক্রবার বালোগুন এই অভিজ্ঞতাকে ‘অবাস্তব’ বলে বর্ণনা করেন। অনেকের কাছে অন্যায্য মনে হওয়া লাল কার্ডের পর তার শান্ত প্রতিক্রিয়ার প্রশংসাও হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই রাগ বা আবেগের বশে প্রতিক্রিয়া জানাতে চাই না। অসংখ্য ছোট ছেলে-মেয়ে আমাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়। তাই অন্যায় মনে হলেও কীভাবে সঠিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়, সেটাই আমাদেরকে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

