মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান।
রোববার (১৮ মে) তেহরানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভির সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে—বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলবর্তী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সম্প্রসারণই ইরানের নীতিগত অবস্থান।
তিনি বলেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এ অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক, স্থিতিশীল ও টেকসই সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা (ইসরায়েল) সবসময় বিভেদমূলক পরিকল্পনা ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করে মুসলিম দেশগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে।”
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের ৪০ দিন পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। পেজেশকিয়ান আশা প্রকাশ করেন, এসব কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টা অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা জোরদার করবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের কোনো সচেতন ও স্বাধীন বিবেক এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মেনে নিতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পেজেশকিয়ান বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ভেতরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল বা উৎখাত করা। কিন্তু তারা কখনো কল্পনাও করেনি যে ইরানের মহান, সচেতন ও মর্যাদাবান জনগণ ঐক্য ও শক্তির সঙ্গে নিজেদের দেশের পাশে দাঁড়াবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে অনুপ্রবেশ করানোর পরিকল্পিত চেষ্টা চালিয়েছে।
তিনি পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরাকের প্রশংসা করেন, কারণ তারা নিজেদের মাটি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই আগ্রাসন ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হয়, যেখানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়।
জবাবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চল এবং এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে প্রতিদিন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধের ৪০তম দিনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
অন্যদিকে বক্তব্যে পেজেশকিয়ান সীমান্ত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সহজ করতে পাকিস্তানের নেওয়া পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, তেহরান ও ইসলামাবাদ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ করতে পারে।
তিনি বলেন, “যুদ্ধের ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যয় হয়েছে, তার পরও এসব ঘটনা ইরান ও পাকিস্তানকে আরও কাছাকাছি এনেছে। বর্তমানে অর্থনীতি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।”
তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ অঞ্চলজুড়ে শান্তি জোরদার, উত্তেজনা কমানো এবং গঠনমূলক সম্পর্ক বৃদ্ধির পথ তৈরি করতে পারে।
পেজেশকিয়ান আবারও বলেন, দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা ও আরও গভীর করা উভয় দেশ এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের যৌথ স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি মুসলিম দেশগুলোকে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত মিলের ভিত্তিতে ঐক্য ও সমন্বয় জোরদার করার আহ্বান জানান, যাতে বহিরাগত শক্তি ও ইসরায়েলের হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসনের সুযোগ কমে যায়।
তিনি বলেন, “মুসলিম বিশ্বের প্রধান দেশগুলোকে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে, যাতে এ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ ইসলামী ঐক্য ও সংহতি থাকলে জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা কখনো মুসলিম দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সাহস পাবে না।”
অন্যদিকে পাকিস্তানের মন্ত্রী মোহসিন নাকভি বলেন, উত্তেজনা কমাতে ইসলামাবাদ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আঞ্চলিক ঘটনাবলির প্রকৃত চিত্র ও বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা এখন জনমতের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে সবসময় ঘনিষ্ঠ ও ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক ছিল এবং উভয় দেশ সেই সম্পর্ক আরও জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
দুই দেশের কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মোহসিন নাকভি শনিবার দুই দিনের এক অনির্ধারিত সফরে তেহরানে পৌঁছান। সেখানে তিনি ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইস্কান্দার মোমেনি সঙ্গে বৈঠক করেন এবং রোববার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
সূত্র: মেহের নিউজ

