রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ। মানুষ চেষ্টা করে, পরিকল্পনা করে, উপার্জনের পথ খোঁজে; কিন্তু চূড়ান্তভাবে রিজিকের ফয়সালা আসমান থেকেই হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিক আল্লাহ নিজ দায়িত্বে রাখেননি। তিনি তাদের স্থায়ী ঠিকানাও জানেন এবং সাময়িক ঠিকানাও। সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে। (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬)
কিন্তু শয়তান মানুষের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে; বিশেষ করে দারিদ্র্যের ভয় দেখিয়ে মানুষকে অন্যায় পথে ঠেলে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে অশ্লীলতার আদেশ করে, আর আল্লাহ তোমাদেরকে স্বীয় মাগফিরাত ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৬৮)
অর্থাৎ যখন কেউ হালাল-হারামের সীমারেখা মেনে চলতে চায়, তখন শয়তান তাকে বলে, ‘এভাবে চললে তুমি গরিব হয়ে যাবে’, ‘বর্তমান দুনিয়া খুব কঠিন, এত কিছু মেনে বলতে গেলে তো দুনিয়ায় থাকা মুশকিল হয়ে যাবে’ ইত্যাদি। ফলে অনেক মানুষ এই ভয়কে সত্য ভেবে আল্লাহর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং হারামের পথে পা বাড়ায়।
অথচ কেউ যদি মহান আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে চেষ্টা করতে পারে, তাহলে তার রিজিকের জন্য তাকে হারাম পথে পা বাড়াতে হবে না; আল্লাহই তার রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হতে তাহলে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেওয়া হয়, সেভাবে তোমাদেরকেও রিজিক দেওয়া হতো। এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যাবেলা ভরা পেটে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)
এই হাদিসে তাওয়াক্কুলের প্রকৃত অর্থ তুলে ধরা হয়েছে। পাখি যেমন বাসায় বসে থাকে না, বরং চেষ্টা করে; তেমনি মানুষকেও হালালভাবে চেষ্টা করতে হবে; তবে অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে যে রিজিক আল্লাহই দেবেন।
রিজিক শুধু টাকার নাম নয়; ঈমান, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মহব্বত, ইবাদতের সুযোগ, সুস্থতা, নেক স্ত্রী-সন্তান, সৎ প্রতিবেশী বা সহকর্মী—সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। কেউ দুনিয়ার সামান্য কিছু অর্থ পেল, বাড়িঘর পেল, কিন্তু ঈমান, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের মহব্বত ও পরকালের সফলতা পেল না, সে পরিপূর্ণ রিজিক পায়নি।
বলতে গেলে তার এই প্রাপ্তি অস্থায়ী ও দ্রুত ধ্বংসশীল। তাই রিজিকে বরকত পেতে দৈনন্দিন জীবনে সর্বদা আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দিতে হবে; আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। ব্যক্তিজীবন, কর্মজীবন কিংবা পারিবারিক জীবন—সব ক্ষেত্রে আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন ও আখিরাত বিনষ্ট হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আখিরাতের ফসল কামনা করে, তার জন্য আমি তার ফসল বাড়িয়ে দিই। আর যে ব্যক্তি (কেবল) দুনিয়ার ফসল কামনা করে, তাকে আমি তা থেকেই খানিকটা দান করি। আখিরাতে তার কোনো অংশ নেই।’ (সুরা : আশ-শুরা, আয়াত : ২০)
তাই শুধু ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবনকে সাজাতে আল্লাহর আইন লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই। যারা শুধু দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়, তারা দুনিয়ায় কিছু ফল পেতে পারে; কিন্তু আখিরাতে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। অথচ দুনিয়ার জীবন যেভাবেই হোক, একদিন শেষ হয়ে যাবে; কিন্তু আখিরাতের জীবনের শুরু আছে, শেষ নেই। হারাম পথে উপার্জন ও চলাচলের কারণে যদি কারো জাহান্নামের ফয়সালা হয়ে যায়, তার সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগই থাকবে না।
দুনিয়ার জীবনে আমাদের জন্য যা বরাদ্দ রাখা হয়েছে তা আসবেই। সুতরাং কেউ যদি হালাল-হারাম উপেক্ষা করে, স্বার্থপর হয়ে কৌশলে হারামকে হালাল বানাতে চায়, তাহলে সে সাময়িকভাবে সফল মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যায় এবং আখিরাতের স্থায়ী সফলতা হারায়।

