রমজান শুধু সংযমের মাস নয়; এটি আত্মার পুনর্জাগরণের মাস। এই মাসে মুমিনের প্রতিটি দিন যেন এক একটি নীরব দিনলিপি—যেখানে শব্দের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে অনুভব, আর কর্মের চেয়েও ভারী হয় নিয়ত। সেই দিনলিপির প্রতিটি পাতায় আলো ছড়িয়ে দেয় পবিত্র কোরআন—যা শুধু পাঠের জন্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। তাই রাসুল (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, ‘হে আল্লাহ, কোরআনকে আমার হূদয়ের বসন্ত বানিয়ে দিন। আমার দিলের নুর বানিয়ে দিন, পেরেশানির উপশম বানিয়ে দিন। কোরআনের মাধ্যমে যেন আমার দুঃখ-দুর্দশা দূর হয়ে যায়, সে ব্যবস্থা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৩৭১২)
কোরআনের প্রতি গভীর প্রেম ও মমত্বে জীবন সুরভিত হয়। কোরআনের সঙ্গে যার সম্পর্ক যত প্রগাঢ়, তার ঈমান তত সুদৃঢ়। তাই আমাদের কোরআনের সাথে সম্পর্ক আরো মজবুত ও প্রাণবন্ত করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা যখন তা তিলাওয়াত করে, যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত, তখন তারাই তার প্রতি (প্রকৃত) ঈমান রাখে। আর যারা তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত লোক। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১২১)
আর পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত তখনই যথাযথ হয়, যখন মুমিনের জিন্দেগিজুড়ে বিরাজ করে কোরআনের প্রতি যথাযথ বিশ্বাস ও বিশ্বাসের প্রকাশ, চূড়ান্ত আস্থা ও ভালবাসা, সহিহ-শুদ্ধ তিলাওয়াত পাওয়া যায়। এজন্য ঈমানের জন্য অন্যতম প্রধান শর্ত হলো কোরআনের প্রতি যথাযথ ঈমান আনা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! ঈমান আনয়ন করো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসুলের প্রতি এবং তিনি যে কিতাব তাঁর রাসুলের ওপর নাজিল করেছেন, সেই কিতাবের প্রতি এবং যে কিতাবগুলো তার আগে নাজিল করেছেন, তার প্রতি। যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাদের, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসুলদের এবং পরকাল অস্বীকার করে, সে চরম ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৬)
কোরআনের অন্যতম অলৌকিক বৈশিষ্ট্য হলো, এটা এমন এক কিতাব, যা তিলাওয়াত ও পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবং কোরআন তিলাওয়াত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসুল (সা.) নিজেও তিলাওয়াত করতেন এবং উম্মতকেও তিলাওয়াত করে শোনাতেন। সেই বিবরণী আল্লাহ তাআলা বর্ণনা কওে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি (অনেক বড়) অনুগ্রহ করেছেন, যখন তিনি তাদের কাছে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসুল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করে শোনাতেন, তাদের পরিশুদ্ধ করতেন এবং তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দিতেন, যদিও এর আগে তারা সুস্পষ্ট গোমরাহির মধ্যে ছিল।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৬৪)
পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত এমন এক আমল, যার মাধ্যমে ঈমান সজীব হয়। দিলে আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়। সর্বোপরি মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বলেন, ‘মুমিন তো তারাই, (যাদের সামনে) আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় ভীত হয়, যখন তাদের সামনে তাঁর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ঈমানের উন্নতি সাধন করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত: ২)
কোরআন তিলাওয়াত এমন ইবাদত, যার মাধ্যমে দেহ-মন শিহরিত হয় এবং হৃদয় বিগলিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ নাজিল করেছেন উত্তম বাণী-এমন এক কিতাব, যার বিষয়বস্তুসমূহ পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ, (যার বক্তব্যসমূহ) পুনরাবৃত্তিকৃত, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে, এর দ্বারা তাদের শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তারপর তাদের দেহ-মন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে।’ (সুরা : জমার, আয়াত : ২৩)
সুতরাং প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো—হক আদায় করে কোরআন তিলাওয়াত করা। দৈনন্দিন জীবনে একটি সময় কোরআন তিলাওয়াত এবং তাফাক্কুর-তাদাব্বুরের জন্য নির্ধারণ করা। মাসে কমপক্ষে এক খতম কোরআন তিলাওয়াত করা উচিত। ‘আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, আমাকে রাসুল মাসে এক বার খতম করতে বলেছেন। তিনি বলেন, আমি বললাম, আমি এরচে বেশি পারবো। নবীজি বললেন, তাহলে ২০ দিনে খতম করো। তিনি বললেন, আমি আরও বেশি পড়তে পারবো। তখন রাসুল (সা.) বললেন, তাহলে সাত দিনে খতম কর। এরচেয়ে বেশি নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৫৯)
কোরআন শুধু রমজানের জন্য নয়, বরং সারাজীবনে পথ চলার পাথেয়। যে হৃদয় কোরআনকে সঙ্গী করে, সে হৃদয় কখনো অন্ধকারে হারায় না।

