ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে শনিবার (৩ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় মধ্যরাতে সামরিক স্থাপনাসহ বেশ কয়েকটি স্থানে একই সাথে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ জানায়, কারাকাসের ‘লা কার্লোটা’ সামরিক বিমানঘাঁটি এবং ফুয়ের্তে তিউনার প্রধান সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় বেশ কিছু এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে।
এই হামলার পরপরই ভেনেজুয়েলায় জরুরি অবস্থা জারি করে দেশটির সরকার। নিন্দা জানিয়ে বিবৃতিও দেওয়া হয়।
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করেছে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই ট্রুথ সোশ্যালে একথা নিজেই জানিয়েছেন। তবে, মাদুরোকে কীভাবে আটক করা হয়েছে বা তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে জানানো হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ভেনেজুয়েলার ওপর একটি ‘বৃহৎ অভিযান’ চালিয়েছে। দেশটির নেতা, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তার স্ত্রীসহ গ্রেফতার করা হয়েছে এবং দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পোস্টে আরও বলা হয়, ‘এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের আইন-প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।’
মাদুরোকে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মাদকপাচার গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র অভিযুক্ত করেছে, যা তিনি বারবারই অস্বীকার করেছেন। তবে, প্রশ্ন উঠছে মাদুরোকে কোথায় নেওয়া হয়েছে কিংবা কীভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
ভেনেজুয়েলার সরকারও এখনো ট্রাম্পের এই দাবির পক্ষে সত্যতা নিশ্চিত করেনি। ইতোমধ্যে, দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদরিগেজ প্রশ্ন তুলেছেন, সরকার জানে না প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসের অবস্থান কোথায়।
তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলা সরকার উভয়ের জীবিত থাকার তাত্ক্ষণিক প্রমাণ চায়।
এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর গ্রেফতার সংক্রান্ত তথ্যের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছিল। এছাড়া, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্যারিবিয়ান দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েন পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে বলে দাবি বিশ্লেষকদের।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক জলসীমায় কথিত মাদকবাহী নৌকায় বিমান হামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের তথাকথিত মাদক পাচারবিরোধী অভিযানে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ১১৫ জনে।
মার্কিন প্রশাসনের এমন বিচার বহির্ভূত হামলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা। তবে, ট্রাম্প কিছুতেই হামলা বন্ধ করেননি। বরং শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা সাউথ আমেরিকান অঞ্চলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে, ভেনেজুয়েলায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে কলম্বিয়ার এবং কিউবার রাষ্ট্রপ্রধানরা। শনিবার (৩ জানুয়ারি) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস এ তথ্য জানান।
এ হামলার পর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘কলম্বিয়া যেকোনো একপক্ষীয় সামরিক পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে। বিশেষকরে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন খামখেয়ালি আচরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। একইসঙ্গে ভেনেজুয়েলার সাধারণ জনগণকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, কলম্বিয়া প্রতিবেশী দেশের পরিস্থিতি ‘গভীর উদ্বেগের সঙ্গে’ পর্যবেক্ষণ করছে এবং সমস্ত পক্ষকে সংঘাত এড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাকে ‘অপরাধমূলক’ কার্যক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করে এক পোস্টে বলেন, ‘কিউবা এই অপরাধমূলক হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দাবি করছে।’
গত বছর ভেনেজুয়েলায় নির্বাচনে কারচুপিসহ নানা অনিয়মে মাদুরোকে দোষী সাব্যস্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি মাদুরোকে গ্রেফতার সংক্রান্ত তথ্যের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছিলেন ট্রাম্প।
এছাড়া, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক শক্তি মোতায়েনকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ দেশটির ভেতরে কারও মাদুরোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রেরণা হিসেবে দেখেছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এমন ঘটনা সত্য হলে ল্যাটিন আমেরিকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

