মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের বিপক্ষে রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে সমর্থন দিয়েছেন দলীয় প্রাইমারিতে পরাজিত হওয়া হেইলি স্টিভেনস।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের দিন সোমবার কংগ্রেসের প্রার্থীরা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষবারের মতো ভোটারদের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। নির্বাচনের আগে মিশিগানে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। সেখানে আবদুল এল-সাইয়েদ প্রথম মুসলিম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ক্যালিফোর্নিয়াও আলোচনায় এসেছে। কারণ, দেশটির সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগের এমন একটি প্রচেষ্টা দ্রুত নাকচ করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে অভিযোগ ওঠা অনাগরিকদের ভোট গণনা বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই
প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের মেয়াদের শেষ দুই বছরের জন্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টি সামনে রেখে ট্রাম্প সোমবার নির্বাচনের আগে তার শেষ বড় বক্তব্য দেন। তবে বক্তব্যে নির্বাচনের চেয়ে ওয়াশিংটনের লিংকন মেমোরিয়ালের সংস্কার করা প্রতিফলন পুকুরের উন্নয়নকাজ নিয়েই বেশি কথা বলেন।
পরে তিনি ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে টেলিফোনে কথা বলেন। এ সময় রিপাবলিকান ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করতে তিনি বলেন, তারা যেন মনে করেন, ট্রাম্প নিজেই নির্বাচনে প্রার্থী।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের ভোট দিতে হবে। আমাদের লোকজন ভোট দিলে আমরা বিপুল ব্যবধানে জিতব।’
মঙ্গলবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট হবে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে বলে ব্যাপক ধারণা রয়েছে। তবে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন তাদের জন্য আরও কঠিন।
কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হবে এবং ডেমোক্র্যাটরা তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম তদন্তের সুযোগ পাবে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তারা সুপ্রিম কোর্টসহ ফেডারেল আদালতে ট্রাম্পের মনোনীত বিচারপতিদের নিয়োগও আটকে দিতে পারবে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোট গণনা নিয়ে আইনি লড়াই
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের সেই প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে, যার লক্ষ্য ছিল ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ভোটারের ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট গণনা সাময়িকভাবে বন্ধ করা।
ফেডারেল কর্মকর্তাদের অভিযোগ ছিল, এসব ভোটারের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন।
ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ২০ হাজার ভোটারের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। পাশাপাশি অনাগরিক শনাক্ত করার প্রক্রিয়ায় ভুল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনকে সন্দেহভাজন অনাগরিকদের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের দেওয়া ব্যালট আলাদা করে রাখার নির্দেশ দেওয়ার প্রচেষ্টাও বন্ধ করতে বলেছেন।
জরিপে ডেমোক্র্যাটদের ৮ শতাংশ ব্যবধান
রয়টার্স ও ইপসোসের সোমবার সম্পন্ন করা এক জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বিপরীতে রিপাবলিকানদের পক্ষে মত দিয়েছেন ৩৮ শতাংশ।
এদিকে আগাম ভোটের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সোমবার বিকেল পর্যন্ত ডাকযোগে ও সরাসরি ভোট মিলিয়ে ৫ কোটি ৭০ লাখ ভোট পড়েছে। ২০২২ সালের পুরো মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪ কোটি ৫০ লাখ।
মিশিগানে রাজনৈতিক উত্তেজনা
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ এবং রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মধ্যে সিনেটের আসন নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।
ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সাইয়েদ একজন চিকিৎসক ও সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার ইতিহাস গড়বেন।
তবে সপ্তাহান্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে এল-সাইয়েদের কাছে পরাজিত হওয়া প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হেইলি স্টিভেনস রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান।
এরপর এল-সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারশিবির জানায়, রোববার তারা ২৪ লাখ ডলার অনুদান পেয়েছে। এটি তাদের এক দিনে পাওয়া সর্বোচ্চ অনুদান। মূলত ক্ষুদ্র অঙ্কের অনুদান থেকেই এই অর্থ এসেছে।
মিশিগানে জন্ম নেওয়া মিসরীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম এল-সাইয়েদকে ট্রাম্প ও অন্যান্য রিপাবলিকান নেতা বিভিন্নভাবে আক্রমণ করেছেন। তাঁর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি প্রমাণ ছাড়াই তাঁকে সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এল-সাইয়েদ এসব অভিযোগের জবাবে তাঁর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সোমবার ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে রজার্স এল-সাইয়েদকে ‘অত্যন্ত চরমপন্থী’ বলে আখ্যায়িত করেন।
মিশিগানে এক নির্বাচনী সমাবেশে রজার্স বলেন, ‘এই নির্বাচন কখনোই কারও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে ছিল না। এটি সব সময় নির্ভর করেছে একজন মানুষ কীভাবে চিন্তা করেন, তাঁর দর্শন ও আদর্শ কী।’
অন্যদিকে সোমবারের সমাবেশে ঐক্যের আহ্বান জানান এল-সাইয়েদ। তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, বর্ণ, যৌন অভিমুখিতা, লিঙ্গপরিচয় ও ধর্মীয় বিশ্বাসের বিভেদ দূর করে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
আলাস্কায় ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপের চেষ্টা
আলাস্কাতেও নির্বাচনী বিরোধে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
রোববার একজন ফেডারেল বিচারক যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের দায়ের করা একটি মামলা খারিজ করে দেন। মামলাটির লক্ষ্য ছিল, রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভান অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলে আলাস্কার নির্বাচনের ফলাফল অনুমোদন বন্ধ করা।
বিচার বিভাগের যুক্তি ছিল, একই ব্যালটে ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়র নামের আরেক প্রার্থী থাকায় ভোটাররা বিভ্রান্ত হতে পারেন।
আলাস্কায় একই পদে দুই সুলিভানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনের পর বিতর্ক শুরু হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার প্রচারশিবির প্রতিদ্বন্দ্বী ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়রকে নির্বাচনে দাঁড় করাতে ভূমিকা রেখেছিল।
তবে পেলটোলা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়রও পেলটোলার প্রচারশিবিরের সঙ্গে সমন্বয়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রোববার সিনেটর ড্যান সুলিভান বলেছেন, মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফলাফল তিনি মেনে নেবেন। যদিও এ ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসন ফৌজদারি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
সোমবার আলাস্কার এক নির্বাচনী সমাবেশে তাঁকে ‘প্রকৃত ড্যান সুলিভান’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
সেখানে তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা আলাস্কাকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু আলাস্কার বিষয় নয়। এই মুহূর্তে আমেরিকার স্বাধীনতার জন্য আমরাই প্রতিরক্ষাপ্রাচীর।’
এদিকে ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়রের একজন সমর্থক জানিয়েছেন, শুক্রবার এফবিআইয়ের কর্মকর্তারা তাঁকে ৫০০ ডলারের অনুদান দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
ব্যারি ব্র্যাকেন নামের ওই ব্যক্তি আলাস্কার পিটার্সবার্গ শহরের একজন অবসরপ্রাপ্ত মৎস্যবিজ্ঞানী। তাঁর দাবি, ড্যানিয়েল জে. সুলিভান জুনিয়রের সঙ্গে তাঁর ৪০ বছরের বেশি সময়ের পরিচয় রয়েছে। তিনি তদন্তকারীদের বলেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবেই ওই প্রার্থীর প্রচারশিবিরে অনুদান দিয়েছেন। এরপর কর্মকর্তারা দ্রুত চলে যান।
এ বিষয়ে এফবিআই কোনো মন্তব্য করেনি।
সূত্র: রয়টার্স

