spot_img

যৌথ পরিবার নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

অবশ্যই পরুন

পরিবার মানুষের আশ্রয়, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার কেন্দ্র। মা-বাবার সেবা, ভাইবোনের পাশে দাঁড়ানো এবং আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া পারিবারিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে একই পরিবারের একাধিক প্রজন্ম একসঙ্গে বসবাস করলে কখনো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, পর্দা, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার ও পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমাদের করণীয় কী, তা জানা থাকলে আমাদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ হবে।

স্ত্রীর বাসস্থানের অধিকার: ইসলামে স্ত্রীর উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দাম্পত্য দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবন যাপন করো।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৯)

বিখ্যাত ফকিহ ইমাম কাসানি (রহ.) স্ত্রীর ভরণপোষণ ও বাসস্থানের বিধান আলোচনা করতে গিয়ে বাসস্থানের ব্যবস্থা করাকে স্বামীর দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২৩)

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে বসবাস করো, তাদেরও সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করো।’ (সুরা তালাক, আয়াত : ৬)

আয়াতটি তালাকপ্রাপ্ত নারীদের ইদ্দতকালীন বাসস্থান সম্পর্কে অবতীর্ণ হলেও ফকিহগণ স্ত্রীর বাসস্থানের অধিকার আলোচনায় এ আয়াতকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিখ্যাত ফকিহ আল্লামা আলাউদ্দিন আল-হাসকাফি (রহ.) উল্লেখ করেছেন, স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীকে এমন বাসস্থানে রাখা, যেখানে স্বামীর পরিবারের সদস্য ও স্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবাসের কারণে তার ব্যক্তিগত পরিসর ক্ষুণ্ণ না হয়। (আদ দুররুল মুখতার : ১/২৬২; আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ : ১/৫৭৮)

আল্লামা ইবনে আবেদিন (রহ.) স্ত্রীর বাসস্থানের ধরন, পৃথক থাকার ব্যবস্থা এবং পারিবারিক পরিস্থিতির আলোকে এ বিধানের বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৫৯৯-৬০১)

মূল বিষয় হলো, স্ত্রীর জন্য এমন বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকা, যেখানে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও দাম্পত্য জীবনের অধিকার রক্ষিত হয়। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবাসের কারণে যদি এসব অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, তাহলে স্ত্রীকে সেই পরিস্থিতিতে থাকতে বাধ্য করা সমীচীন নয়।

তবে পৃথক বাসস্থানের অর্থ সব ক্ষেত্রে পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া নয়। একই বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর জন্য স্বতন্ত্র ও নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা থাকলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী স্ত্রীর বাসস্থানের অধিকার পূরণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঘরের পৃথক প্রবেশব্যবস্থা, গোপনীয়তা এবং অন্যদের অননুমোদিত প্রবেশ থেকে সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লামা ইবনে আবেদিন (রহ.)-এর আলোচনায় বোঝা যায়, বাসস্থানের ধরন নির্ধারণে মানুষের প্রচলিত জীবনযাত্রা ও বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচ্য। ফলে প্রত্যেক অবস্থায় একই ধরনের বাড়ি বা একই বিন্যাসকে বাধ্যতামূলক বলা ঠিক নয়। (রদ্দুল মুহতার : ৩/৬০১)

যৌথ পরিবারে পর্দা ও পারিবারিক সম্পর্ক: যৌথ পরিবারে বসবাসের ক্ষেত্রে পর্দার বিধান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্বামীর পরিবারের সব সদস্য স্ত্রীর মাহরাম নন। বিশেষত দেবর, ভাশুর ও শশুর ব্যতীত স্বামীর অন্যান্য আত্মীয়ের সঙ্গে চলাফেরায় শরিয়তের পর্দার বিধান মানতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা নারীদের কাছে প্রবেশ করা থেকে সাবধান থাকো।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! দেবর সম্পর্কে আপনার মত কী?’ তিনি বললেন, ‘দেবর তো মৃত্যুসমতুল্য বিপদ।’ (বুখারি, হাদিস: ৫২৩২)

এ হাদিসে স্বামীর অমাহরাম আত্মীয়দের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। কারণ, ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্কের কারণে অনেক সময় পর্দার ব্যাপারে অসতর্কতা তৈরি হয়। তাই যৌথ পরিবারে বসবাস করলেও পর্দা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নারী-পুরুষের সীমারেখা রক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে, যৌথ পরিবারে বসবাস করাই যে নিষিদ্ধ কিংবা অনৈসলামিক, এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের অধিকার রক্ষা করলে, পর্দার বিধান মেনে চললে এবং কারও ওপর অন্যায়ভাবে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে না দিলে এবং অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে একসঙ্গে বসবাসের মধ্যে সহযোগিতা ও কল্যাণের সুযোগ রয়েছে।

মা-বাবার অধিকার ও আমাদের করণীয়: স্ত্রীর অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে মা-বাবার অধিকার অবহেলা করা যাবে না। আবার মা-বাবার সেবার অজুহাতে স্ত্রীর ন্যায্য অধিকারও ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রত্যেকের সঙ্গে তার প্রাপ্য অনুযায়ী সদাচরণ করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করবে।’ (সুরা ইসরা, আয়াত : ২৩)

এই আয়াতে মা-বাবার প্রতি সদাচরণের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। সুতরাং স্বামী-স্ত্রী পৃথক বাসস্থানে থাকলেও মা-বাবার খোঁজখবর নেওয়া, তাঁদের প্রয়োজন পূরণ করা এবং যথাসাধ্য সেবা করা সন্তানের দায়িত্ব। একইভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও পরস্পরের প্রতি সহমর্মী হতে হবে।

পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ন্যায়বিচার। স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ, পুত্রবধূর ওপর অন্যায়ভাবে কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কিংবা পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে কারও অধিকার ক্ষুণ্ণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

মূলকথা হলো, যৌথ পরিবারে বসবাস করা কিংবা পৃথক থাকা, কোনোটিকেই ইসলামের আবশ্যিক পারিবারিক কাঠামো হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। বরং ইসলাম প্রত্যেকের অধিকার রক্ষা, পর্দা বজায় রাখা, মা-বাবার প্রতি সদাচরণ এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। তাই পারিবারিক ব্যবস্থার ধরন যা-ই হোক, তা যেন শরিয়তের বিধান ও পারস্পরিক অধিকারের পরিপন্থী না হয়। তবে বর্তমান সময়ের মানুষের মানসিকতা ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায়, স্ত্রী একত্রে বসবাসে রাজি হলেও এবং পৃথক থাকার কারণে আত্মীয়স্বজন অসন্তুষ্ট হলেও পৃথক রাখাই কল্যাণকর। এতে বহু অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা ও অনিষ্টের পথ বন্ধ হয়। (ইসলাহে ইনকিলাব, আশরাফ আলী থানবী রহ.,২/১৮৮; মালফুজাতে আশরাফিয়া, পৃষ্ঠা:৩৬)

সর্বশেষ সংবাদ

যেকোনো স্থানে হুমকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক জবাবের নির্দেশ খামেনির

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনি সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ যুদ্ধপ্রস্তুতি বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। শনিবার (৩১ অক্টোবর) জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারদের...

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ