পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপকে ঘিরে। কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) জানিয়েছে, প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাবে তারা। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে দলটির আন্দোলন চলার মধ্যেই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদ ও পিটিআইয়ের বিরোধ আরও জোরালো হয়েছে।
পিটিআইয়ের কেন্দ্রীয় তথ্য সম্পাদক শেখ ওয়াকাস আকরাম আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দলটি জরুরি অবস্থা জারি এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় গভর্নরের শাসন প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকে আইনি চ্যালেঞ্জ জানানোর পরিকল্পনা করেছে।
দলের মহাসচিব সালমান আকরাম রাজার নেতৃত্বাধীন একটি আইনি কমিটি ইতিমধ্যে এ বিষয়ে আবেদন প্রস্তুত করেছে। তবে আবেদনটি সুপ্রিম কোর্টে, নাকি ফেডারেল সাংবিধানিক আদালতে দাখিল করা হবে, তা নিশ্চিত করেননি আকরাম।
রবিবার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির ঘোষণা দেন। এর ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়ায় পিটিআইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারব্যবস্থা স্থগিত হয়ে যায়।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি সোমবার সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, আফগানিস্তানের সঙ্গে অরক্ষিত সীমান্ত থাকা খাইবার পাখতুনখোয়ায় সন্ত্রাসবাদ কার্যকরভাবে মোকাবিলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
পেশোয়ারে সাংবাদিকদের নাকভি বলেন, পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ বা অন্যান্য পদক্ষেপ নেওয়া হলেও স্থানীয় সরকারের নেতৃত্ব ও সহযোগিতা ছাড়া কোনো যুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব নয়।
রবিবার প্রকাশিত ঘোষণায় কেন্দ্রীয় সরকার অভিযোগ করে, প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দায়িত্ববোধ, সদিচ্ছা ও দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী সোমবার জানান, বরখাস্ত হওয়া মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদি এবং তাঁর মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখী পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আফ্রিদি।
কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে ও বিপক্ষে রাজনৈতিক এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।
স্বাধীন রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেজিসলেটিভ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সির (পিলডাট) যুগ্ম পরিচালক আসিয়া রিয়াজ আল-জাজিরাকে বলেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রম থেকে প্রাদেশিক সরকারের ইচ্ছাকৃতভাবে সরে দাঁড়ানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে জরুরি অবস্থা জারির সাংবিধানিক ভিত্তি তুলে ধরেছে ফেডারেল সরকার।
তবে লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের সহযোগী শিক্ষক ও আইনজীবী হাসান আবদুল্লাহ নিয়াজি এ যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
তাঁর মতে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় কার্যকর আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ ছিল এবং প্রাদেশিক সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করেছিল। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের পদক্ষেপকে তিনি প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেন।
গত মাসে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ইখতিয়ার ওয়ালি খান এ বিষয়ে ১৪ পৃষ্ঠার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন।
ওই প্রতিবেদনে পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর হার বৃদ্ধি, প্রাদেশিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিভাগের জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
তবে পিটিআইয়ের তথ্য সম্পাদক শেখ ওয়াকাস আকরাম অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর দাবি, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিহত ৯০০-এর বেশি সেনা, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যের পরিবারকে প্রাদেশিক সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৮৩ কোটি রুপি সহায়তা দিয়েছে।
আকরামের দাবি, এ ধরনের সহায়তা অন্য কোনো প্রদেশ দেয়নি।
ইমরান খানকে মুক্ত করার দাবিতে পিটিআইয়ের ইসলামাবাদ অভিমুখী লং মার্চ চলার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত এসেছে। দলের নেতারা জানিয়েছেন, নানা বাধা ও দমন-পীড়নের অভিযোগ সত্ত্বেও তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
আকরাম বলেন, লং মার্চ শেষ হয়নি। তবে দলের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন দমন-পীড়ন চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, রবিবার ইসলামাবাদে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বলেন, ইমরান খানের সমর্থনে পিটিআইয়ের অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে সরকারের আপত্তি নেই। তাঁর ভাষ্য, সরকারের মূল উদ্বেগ সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা নিয়ে এবং এ ক্ষেত্রে পিটিআইয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন।
পিটিআই নেতা ও খাইবার পাখতুনখোয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী তৈমুর ঝাগ্রা অবশ্য বলেন, দলটির সঙ্গে সরকারের আলোচনার মূল বিষয় ছিল ইমরান খানকে ঘিরে। তাঁর মতে, ইমরান খানের চিকিৎসা ও সাক্ষাতের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচির আলোচনা সন্ত্রাসবাদবিরোধী কৌশলের দিকে নিয়ে যাওয়া অযৌক্তিক।
মহসিন নাকভি দাবি করেন, আলোচনার সময় খাইবার পাখতুনখোয়ার ১২টি জেলায় জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে পিটিআই সম্মতি দিয়েছিল।
তবে এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন শেখ ওয়াকাস আকরাম। তাঁর বক্তব্য, দলটি এমন কোনো প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। পিটিআইয়ের আশঙ্কা ছিল, সামরিক অভিযানের ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রাণহানি ও দুর্ভোগ বাড়তে পারে এবং এর রাজনৈতিক দায় শেষ পর্যন্ত প্রাদেশিক নেতৃত্বকেই নিতে হবে।
আকরামের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে ভোট নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার কারণে তাঁদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের বিষয়টি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের বিরোধ নতুন মাত্রা পেয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাকে সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও পিটিআই এটিকে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এখন আদালতে এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগ দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মোড় আনতে পারে। আল জাজিরা

